প্রত্যক্ষদর্শী বা টিকিট না থাকলেই ক্ষতিপূরণ বাতিল নয়, রেল দুর্ঘটনা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় কলকাতা হাইকোর্টের

রেল দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, রেল দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ দাবি করতে গেলে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শী বা যাত্রার টিকিট পেশ করতেই হবে—এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। যদি পুলিশি তদন্ত, জব্দ তালিকা (সিজার লিস্ট) এবং অন্যান্য পরিস্থিতিগত প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে মৃত ব্যক্তি বৈধ টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন এবং একটি “অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা”র শিকার হয়েছেন, তাহলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার অস্বীকার করা যায় না।
বিচারপতি বিশ্বরূপ চৌধুরী রেলওয়ে ক্লেমস ট্রাইব্যুনালের একটি আদেশ বাতিল করে এই রায় দেন। আদালত মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও অন্যান্য আইনগত উত্তরাধিকারীদের আবেদন মঞ্জুর করে রেল কর্তৃপক্ষকে ৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং দাবি দাখিলের তারিখ থেকে বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এই অর্থ আট সপ্তাহের মধ্যে জমা দিতে হবে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর মৃত ব্যক্তি বৈদ্যবাটি থেকে বেলুড় পর্যন্ত একটি রিটার্ন টিকিট কেটেছিলেন। বেলুড়ে কাজ শেষ করে তিনি ব্যান্ডেল লোকালে বাড়ি ফিরছিলেন। ট্রেনটি রিষড়া ও শ্রীরামপুর স্টেশনের মাঝামাঝি পৌঁছলে তিনি চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর সরকারি রেল পুলিশ অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে উল্লেখ করা হয়, মৃতের পকেট থেকে একটি রেল টিকিট উদ্ধার করা হয়েছিল এবং তা জব্দ তালিকায় নথিভুক্ত করা হয়। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য দেহ পাঠানো হয়।
কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, মৃতের কাছ থেকে কোনও টিকিট উদ্ধার হয়নি। এই যুক্তি মেনে রেলওয়ে ক্লেমস ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণের আবেদন খারিজ করেছিল।
হাইকোর্টে মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুলিশি তদন্ত, জব্দ তালিকা এবং মৃতের স্ত্রীর সাক্ষ্যই প্রমাণ করে যে তিনি বৈধ টিকিট কেটে ট্রেনে ভ্রমণ করছিলেন। অন্যদিকে, রেল কর্তৃপক্ষ তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের উপর নির্ভর করে দাবি করে যে কোনও টিকিট পাওয়া যায়নি।
আদালত জানায়, রেল দুর্ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাত্রীরা একা ভ্রমণ করেন। তাই পরিবারের পক্ষে প্রত্যক্ষদর্শী হাজির করা প্রায় অসম্ভব। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশি তদন্ত ও সরকারি নথির গুরুত্ব অনেক বেশি। তদন্তকারী অফিসারকে জেরা না করে বা সরকারি নথি ভুয়া প্রমাণ না করে সেই নথি বাতিল করা যায় না।
হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্টের Union of India বনাম Rina Devi মামলার রায়েরও উল্লেখ করে জানায়, শুধুমাত্র টিকিট না পাওয়া গেলেই মৃত ব্যক্তি বৈধ যাত্রী ছিলেন না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রথমে আবেদনকারীকে প্রাথমিক প্রমাণ দিতে হবে, তারপর সেই দাবি খণ্ডনের দায় রেল কর্তৃপক্ষের।
সব দিক বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মৃত ব্যক্তি বৈধ যাত্রী ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু রেলওয়ে আইন, ১৯৮৯-এর ১২৪এ ধারায় বর্ণিত “অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা”র আওতায় পড়ে। ফলে রেলওয়ে ক্লেমস ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাতিল করে মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।


