
উত্তরাধিকার আইন: হিন্দু ও মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে সম্পত্তির ভাগ বাঁটোয়ারা
ভারতে সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রধানত দুটি ভিন্ন আইনি ব্যবস্থার দ্বারা পরিচালিত হয়: হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ (Hindu Succession Act, 1956) এবং মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law)। এই দুটি আইনেই উত্তরাধিকারীর সম্পর্ক এবং লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে ভাগের নিয়ম আলাদা।
১. হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ১৯৫৬ (Hindu Succession Act, 1956)
এই আইনটি বৌদ্ধ, জৈন এবং শিখ ধর্মাবলম্বীদের জন্যও প্রযোজ্য।
ক. পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ কেমন হবে?
পৈতৃক সম্পত্তি বলতে বোঝায়, যা চার প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এবং ভাগ হয়নি।
- জন্মগত অধিকার (Birthright): ২০০৫ সালের সংশোধনের ফলে ছেলে ও মেয়ে উভয়েই পৈতৃক সম্পত্তিতে জন্মসূত্রে সমান অধিকার পান। মেয়েদের এখন ছেলেদের মতোই ‘কো-পারসেনার’ বা সহ-উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ, বাবার সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার বিয়ের পরেও বজায় থাকে।
- স্ব-অর্জিত সম্পত্তি (Self-Acquired Property): যদি বাবা বা পরিবারের কেউ নিজে সেই সম্পত্তি অর্জন করে থাকেন এবং উইল না করে মারা যান, তবে তা তাঁর প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারীদের (Class I Heirs) মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হয়। প্রথম শ্রেণীর উত্তরাধিকারীরা হলেন— মা, স্ত্রী (বা বিধবা), ছেলে এবং মেয়ে।
খ. সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায় (Latest SC Verdict)
ভিনিতা শর্মা বনাম রাকেশ শর্মা (Vineeta Sharma vs Rakesh Sharma, 2020):
সুপ্রিম কোর্টের এই যুগান্তকারী রায়ের ফলে উত্তরাধিকার আইনে মেয়েদের অধিকার আরও মজবুত হয়। আদালত রায় দেয় যে, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ২০০৫ কার্যকর হওয়ার আগে বাবা বেঁচে থাকুন বা না থাকুন, মেয়েরা পৈতৃক সম্পত্তিতে জন্মগতভাবে সহ-উত্তরাধিকারীর সমান অধিকার পাবে। অর্থাৎ, বাবার মৃত্যুর তারিখ এখানে আর কোনো বাধা সৃষ্টি করে না। এই রায়টি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সম্পত্তিতে সমানাধিকারের পথ প্রশস্ত করেছে।
২. মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law)
মুসলিমদের উত্তরাধিকার আইন কোরআন, সুন্নাহ এবং ইজমার উপর ভিত্তি করে তৈরি এবং এটি অত্যন্ত কঠোর।
ক. মুসলিম আইনে সম্পত্তির ভাগ কেমন হয়?
- উইল (Will) করার ক্ষমতা: একজন মুসলিম ব্যক্তি তাঁর মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ (1/3rd)-এর বেশি সম্পত্তি উইল করতে পারেন না। বাকি সম্পত্তি শরিয়ত আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হবে।
- উত্তরাধিকারীর প্রকারভেদ: উত্তরাধিকারীরা সাধারণত দুটি প্রধান ভাগে ভাগ হন—
- শারার্স (Sharers): যারা একটি নির্দিষ্ট ভাগ পান (যেমন স্ত্রী বা মা)।
- রেসিডুয়ারিজ (Residuaries): যারা শারার্সদের ভাগ দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি পান (যেমন ছেলে, ভাই)।
- লিঙ্গভিত্তিক বন্টন: মুসলিম আইনে, সাধারণত মেয়েরা ছেলেদের অর্ধেক সম্পত্তি পান। অর্থাৎ, ছেলে ও মেয়ের ভাগের অনুপাত হলো ২:১। এর কারণ, মুসলিম আইনে মেয়েদেরকে স্বামীর কাছ থেকেও ‘মাহর’ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার দেওয়া হয়।
- স্ত্রীর অধিকার: স্বামীর মৃত্যুর পর, সন্তান থাকলে স্ত্রী ১/৮ অংশ এবং সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশ পান।
খ. সুপ্রিম কোর্টের রায় (প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ)
মুসলিম ব্যক্তিগত আইন যেহেতু ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে চলে, তাই কোর্ট সাধারণত সরাসরি এই আইনের ধারাগুলিতে হস্তক্ষেপ করে না। তবে আদালত বহুবার এই আইনগুলির মধ্যে বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছে এবং বিভিন্ন রায়ে সমতার উপর জোর দিয়েছে। যেমন, আদালতের বিভিন্ন রায়ে মুসলিম নারীদের বিবাহের ক্ষেত্রে ‘খোলা’ (একতরফা বিবাহ বিচ্ছেদ) এবং বিবাহ বিচ্ছেদের পর ভরণপোষণের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।



