হাইকোর্ট

হাত টানলেই যৌন নিগ্রহ নয়, দণ্ড স্থগিত করল মাদ্রাজ হাইকোর্ট

যৌন উদ্দেশ্য ছিল কি না, আপিলে বিস্তারিত বিচার প্রয়োজন বলে পর্যবেক্ষণ আদালতের

মাদ্রাজ হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে পকসো (POCSO) আইনে দোষী সাব্যস্ত এক ব্যক্তির সাজা স্থগিত করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগে বর্ণিত ঘটনাকে সরাসরি যৌন নিগ্রহ (Sexual Assault) বলা যায় কি না, তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন রয়েছে। তাই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর রাখা সমীচীন হবে না।

বিচারপতি এম. নির্মল কুমার অভিযুক্তের করা আপিল বিচারাধীন থাকাকালীন সাজা স্থগিতের আবেদন শুনানির সময় এই নির্দেশ দেন।

মামলার ঘটনাটি ২০২০ সালের ১ মার্চ চেন্নাইয়ে ঘটে বলে অভিযোগ। প্রসিকিউশনের দাবি, এক নাবালিকা তার পিসির বাড়ি থেকে খাবার আনতে গিয়েছিল। সেই সময় একই আবাসনের বাসিন্দা অভিযুক্ত মান্ডাই ওরফে মনোগারন একটি বারান্দা থেকে তাকে লক্ষ্য করে শিস দেন। নাবালিকা সাড়া না দিলে অভিযুক্ত নিচে নেমে এসে তার হাত টেনে ধরেন এবং যৌন উদ্দেশ্যে তার দিকে তাকিয়ে হাসেন বলে অভিযোগ।

পরে নাবালিকার মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে বিষয়টি বিচারাধীন আদালতে যায়।

চেন্নাইয়ের পকসো মামলার বিশেষ আদালত অভিযুক্তকে পকসো আইনের ৮ নম্বর ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত তাকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা জরিমানার সাজা দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে অভিযুক্ত সাজা স্থগিতের আবেদন জানান।

অভিযুক্তের আইনজীবী আদালতে বলেন, অভিযুক্ত এবং নাবালিকার পরিবার একই আবাসিক চত্বরে বসবাস করতেন। এর আগে অভিযুক্তের সঙ্গে নাবালিকার বাবার একটি বিরোধ হয়েছিল। সেই বিরোধের জেরেই ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

প্রতিরক্ষা পক্ষ আরও যুক্তি দেয়, প্রসিকিউশনের বক্তব্য সম্পূর্ণ সত্য ধরলেও অভিযোগের মূল বিষয় হলো অভিযুক্ত নাবালিকার হাত টেনেছিলেন। এর বাইরে কোনও শারীরিক স্পর্শ বা অন্য কোনও যৌন আচরণের অভিযোগ নেই। তাই ঘটনাটি প্রমাণিত হলেও তা সর্বোচ্চ পকসো আইনের যৌন হয়রানি (Sexual Harassment)-সংক্রান্ত ধারার আওতায় পড়তে পারে, কিন্তু যৌন নিগ্রহের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।

আইনজীবী আরও জানান, বিচারিক আদালতের রায়ের পরপরই তাঁর অনুপস্থিতির কারণে সাজা স্থগিতের আবেদন করা সম্ভব হয়নি। ফলে তিন বছরের সাজা হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্ত জেলেই ছিলেন।

অন্যদিকে, রাজ্যের পক্ষ থেকে এই আবেদন বিরোধিতা করা হয়। সরকারি আইনজীবী বলেন, তদন্তের সময়, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা জবানবন্দি এবং বিচার চলাকালীন সাক্ষ্যে নাবালিকা একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর বয়ানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে অভিযুক্ত যৌন উদ্দেশ্যে তার হাত ধরেছিলেন। তাই বিচারিক আদালত যথাযথভাবে প্রমাণ মূল্যায়ন করেই দোষী সাব্যস্ত করেছে।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারপতি এম. নির্মল কুমার মামলার নথি পর্যালোচনা করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, ঘটনাটির একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী নাবালিকা নিজেই। অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্ত প্রথমে শিস দেন, নাবালিকাকে ডাকেন এবং সাড়া না পেয়ে তার হাত টেনে ধরেন।

আদালত পর্যবেক্ষণ করে, “এই ধরনের আচরণকে সরাসরি যৌন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায় না। সর্বোচ্চ এটিকে হয়রানি বলা যেতে পারে, কিন্তু তা অবিলম্বে যৌন নিগ্রহ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।”

বিচারপতি আরও বলেন, এই আইনি প্রশ্নগুলির বিস্তারিত মূল্যায়ন আপিল শুনানির সময় প্রয়োজন। অর্থাৎ, মামলায় এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা চূড়ান্ত শুনানিতে গভীরভাবে বিচার করা দরকার।

এই পরিস্থিতিতে এবং আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে সময় লাগবে বিবেচনা করে মাদ্রাজ হাইকোর্ট অভিযুক্তের কারাদণ্ড স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়।

আদালত জানায়, অভিযুক্ত ৫,০০০ টাকার ব্যক্তিগত বন্ড এবং দুজন জামিনদার প্রদান করলে তাকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রতি তিন মাস অন্তর মাসের প্রথম কার্যদিবসে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বিচারিক আদালতে হাজির থাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

কেস টাইটেল: Mandai @ Manogaran v. The State

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button