নির্বাচনী গণতন্ত্রে সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবশালীদের ভূমিকা: স্বাধীন ভোটদানের অধিকার কি বিপন্ন?

গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মূল ভিত্তি হলো ভোটদানের অধিকার (Right to Vote)। এটি কেবল একটি পদ্ধতিগত সুযোগ নয়, এটি নিশ্চিত করে যে জনগণের পছন্দের ভিত্তিতেই গণতান্ত্রিক ফলাফল নির্ধারিত হবে। একটি অর্থবহ নির্বাচনী সিদ্ধান্তের জন্য ভোটারদের কাছে স্বচ্ছ, পক্ষপাতহীন এবং উদ্দেশ্যহীন তথ্য থাকা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার উত্থান এবং ‘রাজনৈতিক প্রভাবশালী’ বা ‘পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্সার’-দের বাড়বাড়ন্ত সেই তথ্যের প্রবাহকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করছে।
সচেতন পছন্দের অধিকার ও গোপনীয় অর্থায়নের প্রভাব
সুপ্রিম কোর্ট ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ (ইলেক্টোরাল বন্ডস মামলা)-এ ঘোষণা করেছে যে, ভোটদানের অধিকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯(১)(এ) থেকে উৎসারিত নাগরিকের ‘জানার অধিকার’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সঠিক তথ্য জানা জরুরি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো যখন প্রচ্ছন্নভাবে (covertly) বিজ্ঞাপন বা প্রচার চালায়, তখন ভোটাররা জানতে পারে না যে এই তথ্যের পেছনে অর্থ বা সুবিধা (quid pro quo) কাজ করছে কিনা। এই গোপন লেনদেন নির্বাচনী অর্থায়নের মতোই গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করে।
শিরোনাম: প্রচলিত আইনের দুর্বলতা এবং ডিজিটাল রণক্ষেত্র
প্রথাগত নির্বাচনী আইনে প্রিন্ট, রেডিও বা টেলিভিশনে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের জন্য খরচ প্রকাশ করা এবং পূর্ব-অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল জগতে রাজনৈতিক দলগুলো সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবশালীদের মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে সেই খরচ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। যদিও নির্বাচন কমিশন ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম এনেছে, তবে ব্যক্তিগত মতামতের ছদ্মবেশে ছড়ানো এই ‘সারোগেট রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন’ নিয়ন্ত্রণ করতে বর্তমান আইনগুলি যথেষ্ট কার্যকর নয়।
ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও অনুগত দর্শকদের ব্যবহার করে জটিল নীতিগুলিকে সরল করে, যা প্রচলিত সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়া তরুণ ভোটারদের কাছে দ্রুত এবং আবেগপূর্ণ বার্তা পৌঁছাতে সাহায্য করে। ফলে তাদের বার্তা প্রথাগত বিজ্ঞাপনের চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রভাব ফেলে।
শিরোনাম: অসঙ্গতি ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক দল এবং ইনফ্লুয়েন্সার উভয়ের জন্যই এই পদ্ধতি লাভজনক। দলগুলি একদিকে খরচ গোপন করতে পারে, অন্যদিকে ইনফ্লুয়েন্সাররা অর্থ বা অন্য সুবিধা পেয়ে নিজেদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতার আড়ালে দলীয় প্রচার করতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় সত্য সাংবাদিকতা ও বিশেষজ্ঞের মতামত গুরুত্ব হারাচ্ছে।
এই ‘তথ্য ব্ল্যাক মার্কেট’ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো: ১. রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর সংজ্ঞা: একজন ইনফ্লুয়েন্সার কখন ব্যক্তিগত মতামত দিচ্ছেন আর কখন অর্থ-প্রদত্ত রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন, তা চিহ্নিত করা কঠিন। ২. আর্থিক লেনদেন প্রকাশ: ইনফ্লুয়েন্সাররা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতে চান, কারণ এটি তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করতে পারে।
সঠিক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন— পণ্য বা পরিষেবার ক্ষেত্রে যেমন রয়েছে, তেমনই রাজনৈতিক প্রচারেও ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য অর্থপ্রাপ্তির বাধ্যতামূলক প্রকাশ (mandatory disclosure) আনা। এই ধরনের ব্যবস্থা না থাকলে ভোটাররা প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক প্রচারে বিভ্রান্ত হবেন এবং তাঁদের স্বাধীন ভোটদানের অধিকার বিপন্ন হবে।



