দিল্লির ২০১৬ সালের গণধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির যাবজ্জীবন সাজা কমিয়ে ২০ বছর করল সুপ্রিম কোর্ট
Ehsaan v. State of National Capital Territory of Delhi

দিল্লির ২০১৬ সালের একটি গণধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত এহসানের সাজা সংশোধন করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রাখলেও, আমৃত্যু কারাভোগের পরিবর্তে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি, আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য হলে তিনি রেমিশন (সাজার মেয়াদ হ্রাসের সুবিধা) পাওয়ার সুযোগও পাবেন।
বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের বেঞ্চ ২০ জুলাই ২০২৬ এই রায় দেয়। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুতরতা যেমন বিবেচনায় রাখতে হবে, তেমনি অভিযুক্তের সংশোধনের সম্ভাবনা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিও বিচার করতে হবে।
মামলার পটভূমি
এহসান দিল্লি হাইকোর্টের ২০১৭ সালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় এবং সাজা বহাল রেখেছিল। ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩৭৬ডি ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল।
প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এক নারী দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন থেকে একটি রিকশায় ওঠেন। তাকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও, অভিযুক্তরা তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়, যেখানে আরেক ব্যক্তি আগে থেকেই উপস্থিত ছিল। পরে ওই ঘটনায় দিল্লির আই.পি. এস্টেট থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়।
সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি প্রথম শুনানির সময় বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার প্রশ্ন পুনর্বিবেচনা করা হবে না। আদালত শুধুমাত্র সাজা আইনসম্মত ও উপযুক্ত ছিল কি না, সেই বিষয়টি বিবেচনার জন্য নোটিস জারি করে।
শাস্তি হতে হবে অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট শাস্তি নির্ধারণে ‘প্রোপোরশনালিটি’ (সমানুপাতিকতা) নীতির ওপর বিস্তারিত আলোচনা করে। আদালত জানায়, শাস্তি এমন হওয়া উচিত যা না অতিরিক্ত কঠোর, না অযথা নমনীয়। অপরাধের প্রকৃতি, সমাজের ওপর তার প্রভাব এবং অভিযুক্তের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি—সবকিছু বিবেচনায় রেখেই শাস্তি নির্ধারণ করতে হবে।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে, “ন্যায্য ও অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি প্রদান করা আদালতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”
বেঞ্চ আরও জানায়, শাস্তির উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে দণ্ড দেওয়া নয়; বরং সমাজে অপরাধ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রয়োজন হলে অভিযুক্তের সংশোধনের সুযোগ নিশ্চিত করাও বিচারব্যবস্থার অংশ।
কেন সাজা কমানো হলো
মামলার নথি পর্যালোচনা করে সুপ্রিম কোর্ট কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। আদালত উল্লেখ করে, অপরাধ সংঘটনের সময় এহসানের বয়স ছিল প্রায় ২৫ বছর এবং তার বিরুদ্ধে এর আগে কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড ছিল না।
এছাড়া, প্রায় ১০ বছর কারাভোগের সময় তিনি ভালো আচরণ বজায় রেখেছেন এবং রেমিশন অর্জন করেছেন বলে যে দাবি করা হয়েছিল, রাষ্ট্রপক্ষ তা অস্বীকার করেনি। একই সঙ্গে, সরকারও এমন কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি, যাতে প্রমাণ হয় যে অভিযুক্তের সংশোধনের কোনো সম্ভাবনা নেই।
তবে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, যৌন সহিংসতার মতো অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি শুধু ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে নয়, পুরো সমাজের বিরুদ্ধেও সংঘটিত অপরাধ। তাই এ ধরনের অপরাধ কঠোরভাবে দমন করা জরুরি।
আইনপ্রণেতার উদ্দেশ্যের দিকেও নজর
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট উল্লেখ করে, ২০১২ সালের নির্ভয়া ঘটনার পর ক্রিমিনাল ল (সংশোধন) আইন, ২০১৩-এর মাধ্যমে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬ডি ধারা প্রবর্তন করা হয়। এই ধারায় গণধর্ষণের জন্য ন্যূনতম ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ আমৃত্যু কারাভোগের বিধান রাখা হয়েছে।
আদালত জানায়, বিচারকদের ন্যূনতম শাস্তির নিচে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে প্রতিটি মামলার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে উপযুক্ত সাজা নির্ধারণ করার বিচারিক ক্ষমতা আদালতের রয়েছে।
আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সব দিক বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট এহসানের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায়ে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। তবে শাস্তি সংশোধন করে আমৃত্যু কারাভোগের পরিবর্তে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। আদালত আরও জানায়, আইন অনুযায়ী যোগ্য হলে তিনি রেমিশনের সুবিধাও পাবেন। একই সঙ্গে মামলার সব বিচারাধীন আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, শাস্তি নির্ধারণে অপরাধের ভয়াবহতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ন্যায়সংগত ও সমানুপাতিক বিচার নিশ্চিত করাও আদালতের সাংবিধানিক দায়িত্ব।


