স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্ন থাকলে ভরণপোষণ নয়, গুজরাট হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়
পারস্পরিক সম্মতিতে আলাদা থাকার ক্ষেত্রে ধারা ১২৫ অনুযায়ী ভরণপোষণ দাবি খারিজ

গুজরাট হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে পারিবারিক আদালতের সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে, যেখানে এক মহিলার ভরণপোষণের আবেদন খারিজ করা হয়েছিল। আদালত জানিয়েছে, ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইন মূলত স্ত্রী বা নির্ভরশীল ব্যক্তিকে অসহায় অবস্থায় পড়া থেকে রক্ষা করার জন্য তৈরি হলেও, আইনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। সেই ব্যতিক্রমগুলিকে উপেক্ষা করে ভরণপোষণের দাবি গ্রহণ করা যায় না।
বিচারপতি এস.ভি. পিন্টো মামলাটি শুনে জানান, পারিবারিক আদালত যে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে হস্তক্ষেপ করার মতো কোনও কারণ নেই। আদালতের মতে, ফৌজদারি রিভিশনের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ক্ষমতা সীমিত। নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তকে নতুন করে আপিলের মতো করে বিচার করা রিভিশন আদালতের কাজ নয়।
মামলার পটভূমি
মামলার আবেদনকারী নয়নাবেন ভূপতভাই রাঠোড়ের সঙ্গে বিবাদীর বিয়ে হয় ২০২১ সালের ৮ জুন। মামলার নথি অনুযায়ী, বিয়ের কিছুদিন পর, ১৪ আগস্ট ২০২১-এ আবেদনকারী স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
এর মাত্র দু’দিন পর, ১৬ আগস্ট ২০২১ তারিখে দু’পক্ষ পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহবিচ্ছেদের একটি দলিল সম্পাদন করেন।
এরপর নয়নাবেন ভূপতভাই রাঠোড় ভাওনগরের পারিবারিক আদালতের দ্বারস্থ হন। তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় ভরণপোষণ দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা তাঁকে হয়রানি ও দুর্ব্যবহার করেছেন। সেই কারণে তিনি স্বামীর বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, স্বামী এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, স্ত্রী স্বেচ্ছায় স্বামীর বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাই আইনের নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী তিনি ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকারী নন।
সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ বিবেচনা করে ভাওনগরের পারিবারিক আদালত তাঁর ভরণপোষণের আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গুজরাট হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন নয়নাবেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
মামলাটি শুনতে গিয়ে বিচারপতি এস.ভি. পিন্টো বলেন, ফৌজদারি রিভিশনের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ক্ষমতা একটি নতুন আপিল শুনানির মতো নয়। পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তে যদি স্পষ্ট আইনি ভুল, বিকৃতি বা প্রমাণের সমর্থনহীনতা না থাকে, তাহলে রিভিশন আদালত সাধারণত নতুন করে প্রমাণের মূল্যায়ন করতে পারে না।
আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫(৪) ধারার কথাও উল্লেখ করে। এই ধারায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্ত্রী ভরণপোষণ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। যেমন, কোনও স্ত্রী যথেষ্ট কারণ ছাড়াই স্বামীর কাছ থেকে আলাদা থাকলে, পারস্পরিক সম্মতিতে আলাদা থাকলে অথবা আইনে উল্লেখিত অন্য কোনও ব্যতিক্রম প্রযোজ্য হলে ভরণপোষণের দাবি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
আদালত বলেছে, এই মামলায় পারিবারিক আদালত যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তা নথিতে থাকা প্রমাণের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। আবেদনকারী স্বেচ্ছায় আলাদা ছিলেন এবং আলাদা থাকার যথেষ্ট কারণ প্রমাণিত হয়নি—পারিবারিক আদালতের এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ধারা ১২৫(৪)-এর আইনি বাধা প্রযোজ্য হয়েছে।
তবে হাইকোর্ট একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে। আদালত জানিয়েছে, কোনও স্ত্রীর বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নেওয়া যাবে না যে তিনি যথেষ্ট কারণ ছাড়াই স্বামীর বাড়ি ছেড়েছেন। প্রতিটি মামলার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ঘটনা, পরিস্থিতি এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নিতে হবে।
রিভিশন আবেদন খারিজ
সমস্ত নথি পর্যালোচনা করার পর গুজরাট হাইকোর্ট জানায়, পারিবারিক আদালতের সিদ্ধান্তে কোনও স্পষ্ট বেআইনি পদক্ষেপ, বিকৃতি বা এখতিয়ারগত ভুল পাওয়া যায়নি।
আদালতের মতে, আবেদনটি মূলত পারিবারিক আদালতের সামনে থাকা প্রমাণকে নতুন করে মূল্যায়ন করার চেষ্টা। কিন্তু রিভিশন মামলায় সেইভাবে নতুন করে প্রমাণ বিশ্লেষণ করার সুযোগ সীমিত।
ফলে হাইকোর্ট নয়নাবেনের ফৌজদারি রিভিশন আবেদন খারিজ করে দেয় এবং ভরণপোষণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে পারিবারিক আদালতের দেওয়া সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই রায়ে করা পর্যবেক্ষণ শুধুমাত্র বর্তমান মামলার জন্য প্রযোজ্য হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্য কোনও স্বাধীন মামলা বা আইনি প্রক্রিয়ার উপর এই পর্যবেক্ষণের কোনও প্রভাব পড়বে না।
কেস টাইটেল
Naynaben Bhupatbhai Rathod v. State of Gujarat & Anr.
কেস নম্বর: R/Criminal Revision Application (For Maintenance) No. 666 of 2023
বিচারপতি: মাননীয় বিচারপতি এস.ভি. পিন্টো
রায়ের তারিখ: ৩০ জুলাই ২০২৬


