ফৌজদারি মামলা চললেও দশ বছরের পাসপোর্ট দিতে হবে, কলকাতা হাইকোর্ট
আদালতের অনুমতি থাকলে এক বছরের পাসপোর্ট দেওয়ার নিয়ম নেই, জানাল হাইকোর্ট

ফৌজদারি মামলা চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট আদালত যদি পাসপোর্ট নবীকরণের অনুমতি দিয়ে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র সেই কারণে পাসপোর্টের মেয়াদ এক বছর করে দেওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে এমনটাই জানাল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ব্যবসায়ী অমিত কুমার আগরওয়ালের পাসপোর্ট স্বাভাবিক নিয়মে ১০ বছরের জন্য নবীকরণ করতে হবে।
বিচারপতি কৃষ্ণ রাওয়ের বেঞ্চ জানিয়েছে, পাসপোর্টের মেয়াদ নির্ধারণের বিষয়টি পাসপোর্ট আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব। কোনও ফৌজদারি আদালত পাসপোর্টের মেয়াদ নির্দিষ্ট করে না দিলে সেটিকে এক বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার কোনও যুক্তি নেই।
মামলায় আদালত আরও জানায়, ১৯৯৩ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তি পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ ভুলভাবে প্রয়োগ করেছে। ওই বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য ছিল ফৌজদারি মামলা চলা ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া, নতুন কোনও শর্ত তৈরি করা নয়।
মামলার পটভূমি
ব্যবসায়ী অমিত কুমার আগরওয়ালের বিরুদ্ধে রাঁচির বিশেষ আদালতে Prevention of Money Laundering Act বা PMLA-এর অধীনে মামলা চলছিল। বিচারাধীন ওই মামলায় আদালতের নির্দেশ মেনে তিনি নিজের পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন।
তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৮ জানুয়ারি ২০২৬। সেই কারণে তিনি পাসপোর্ট নবীকরণের প্রয়োজনীয়তা আদালতের সামনে তুলে ধরেন। রাঁচির বিশেষ আদালত তাঁকে পাসপোর্টটি শুধুমাত্র নবীকরণের জন্য ফেরত দেওয়ার অনুমতি দেয়।
তবে সেই অনুমতির সঙ্গে কয়েকটি শর্তও দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে একটি indemnity bond জমা দিতে বলা হয়। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি আদালতের আগাম অনুমতি ছাড়া বিদেশে যাওয়া যাবে না বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়। নবীকরণ হয়ে গেলে পাঁচ দিনের মধ্যে নতুন পাসপোর্ট আবার আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশও ছিল।
এরপর অমিত কুমার আগরওয়াল পাসপোর্ট নবীকরণের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু রিজিওনাল পাসপোর্ট অফিস তাঁকে জানায়, রাঁচির ট্রায়াল কোর্ট পাসপোর্টের মেয়াদ কত হবে তা নির্দিষ্ট করে দেয়নি। ফলে ২৫ আগস্ট ১৯৯৩ সালের Notification GSR 570(E) অনুযায়ী তাঁকে শুধুমাত্র এক বছরের পাসপোর্ট দেওয়া যেতে পারে।
পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন অমিত কুমার আগরওয়াল।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি কৃষ্ণ রাও Passports Act, 1967, Passport Rules এবং ১৯৯৩ সালের বিজ্ঞপ্তির বিভিন্ন বিধান খতিয়ে দেখেন। আদালত জানায়, পাসপোর্ট দেওয়া, নবীকরণ করা বা তার মেয়াদ নির্ধারণের বিষয়গুলি মূলত পাসপোর্ট আইন ও বিধির অধীন।
১৯৯৩ সালের বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য ফৌজদারি মামলা চলা ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া। কিন্তু এই বিজ্ঞপ্তিকে ব্যবহার করে মূল আইনে নেই এমন নতুন শর্ত তৈরি করা যায় না।
আদালত আরও স্পষ্ট করে, ফৌজদারি আদালতের ভূমিকা মূলত কোনও ব্যক্তিকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, সেই প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে পাসপোর্ট কত বছরের জন্য বৈধ হবে, সেটি Passports Act এবং Passport Rules অনুযায়ী নির্ধারণ করা পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দায়িত্ব।
আদালতের ভাষায়, “The validity period of the passport is to be governed by the Passports Act and the Passport Rules, not by the absence of a court-imposed tenure.”
অর্থাৎ কোনও ফৌজদারি আদালত পাসপোর্টের মেয়াদ নির্দিষ্ট করে না দিলেই পাসপোর্টের মেয়াদ এক বছর করে দিতে হবে—এমন নিয়ম নেই।
পাসপোর্ট থাকা এবং বিদেশ যাওয়া এক বিষয় নয়
এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের Mahesh Kumar Agarwal v. Union of India মামলার সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন বিচারপতি কৃষ্ণ রাও।
সেখানে বলা হয়েছিল, কোনও ব্যক্তির কাছে বৈধ পাসপোর্ট থাকা এবং সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পাওয়া—দুটি পৃথক বিষয়।
অর্থাৎ কারও বৈধ ১০ বছরের পাসপোর্ট থাকতে পারে, কিন্তু ফৌজদারি মামলার কারণে আদালত যদি বিদেশ যাওয়ার আগে অনুমতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে থাকে, তাহলে সেই নির্দেশ মেনেই তাঁকে বিদেশ যেতে হবে।
কেন দশ বছরের পাসপোর্টের নির্দেশ?
কলকাতা হাইকোর্টের মতে, অমিত কুমার আগরওয়ালের ক্ষেত্রে মাত্র এক বছরের পাসপোর্ট দেওয়ার কোনও বাস্তবিক উদ্দেশ্য নেই।
কারণ, ট্রায়াল কোর্ট ইতিমধ্যেই তাঁকে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছে। আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি বিদেশ যেতে পারবেন না। আবার নবীকরণ করা পাসপোর্ট পাঁচ দিনের মধ্যে ট্রায়াল কোর্টে জমা দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে এক বছরের পাসপোর্ট দিলে তাঁকে বারবার পাসপোর্ট নবীকরণের জন্য আদালতের কাছ থেকে পাসপোর্ট ছাড়িয়ে নিতে হবে। অথচ বিদেশ ভ্রমণের উপর ট্রায়াল কোর্টের বিধিনিষেধ আগের মতোই কার্যকর থাকবে।
হাইকোর্টের নির্দেশ
শেষ পর্যন্ত কলকাতা হাইকোর্ট অমিত কুমার আগরওয়ালের রিট আবেদন মঞ্জুর করে। আদালত পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষকে তাঁর পাসপোর্ট স্বাভাবিক নিয়মে ১০ বছরের জন্য নবীকরণ করার নির্দেশ দিয়েছে।
রায় পাওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত আইনগত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পাসপোর্ট নবীকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে ট্রায়াল কোর্টের আগের নির্দেশগুলি বহাল থাকবে। অর্থাৎ নতুন পাসপোর্ট পাওয়ার পর পাঁচ দিনের মধ্যে সেটি আবার আদালতে জমা দিতে হবে এবং বিদেশ যেতে হলে আগের মতোই ট্রায়াল কোর্টের অনুমতি নিতে হবে।
কেস টাইটেল
Amit Kumar Agarwal v. Union of India, Ministry of External Affairs & Ors.
কেস নম্বর: W.P.A. No. 9256 of 2026
বিচারপতি: Justice Krishna Rao
রায়ের তারিখ: ৫ আগস্ট ২০২৬


