সুপ্রিমকোর্ট

মেডিক্যাল ও ফরেনসিক প্রমাণে ভর করে হিমাচল প্রদেশের ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্তকে খালাস সুপ্রিম কোর্টের

চিকিৎসা পরীক্ষায় আঘাতের চিহ্ন না মেলা এবং ফরেনসিক রিপোর্টে রক্ত-শুক্রাণুর প্রমাণ না থাকায় হাইকোর্টের রায় বাতিল করল শীর্ষ আদালত

২০০৯ সালের একটি মামলায় সাড়ে চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের দেওয়া দণ্ড বাতিল করে অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, মামলায় উপস্থাপিত চিকিৎসা পরীক্ষা এবং ফরেনসিক রিপোর্ট প্রসিকিউশনের ঘটনাক্রমকে সমর্থন করে না। বিচারপতি উজ্জল ভূঁইয়া এবং বিচারপতি অতুল এস. চন্দুরকরের বেঞ্চ ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায় খারিজ করে ২০১০ সালে ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া খালাসের নির্দেশ পুনর্বহাল করেছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, আপিলকারী হিমাচল প্রদেশে জয়দেব শর্মা নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে থাকতেন এবং দু’জনে একসঙ্গে কাজ করতেন। ২০০৯ সালের ২৮ জুন অভিযোগকারিণীর মেয়ে তার মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও জয়দেব শর্মার বাড়িতে যায়। পরে সে বাড়ি ফিরে এলে তার মা শিশুটির পোশাকে রক্তের দাগ দেখতে পান। মেয়েকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তিনি কথিত যৌন নির্যাতনের বিষয়টি জানতে পারেন। ওই দিনই সন্ধ্যায় থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়।

২০১০ সালে ট্রায়াল কোর্ট অভিযুক্তকে খালাস দেয়। আদালত জানিয়েছিল, প্রসিকিউশনের প্রমাণে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। পাশাপাশি, চিকিৎসা পরীক্ষার রিপোর্টেও শিশুটির শরীরে কোনও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরে রাজ্য সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০১৬ সালে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের খালাসের রায় উল্টে দিয়ে অভিযুক্তকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার সাজা দেয়।

সুপ্রিম কোর্টে অভিযুক্তের আইনজীবী যুক্তি দেন, হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের বিস্তারিত ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতিগুলিও উপেক্ষা করেছে। তিনি বিশেষভাবে ফরেনসিক রিপোর্টের উল্লেখ করেন। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, শিশুটির পোশাক কিংবা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা সামগ্রীতে রক্ত বা শুক্রাণুর কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি, যদিও বেঞ্জিডিন পরীক্ষা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, রাজ্যের আইনজীবী হাইকোর্টের দেওয়া সাজা বহাল রাখার পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে শিশুটির নিজস্ব সাক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করা উচিত নয়।

শীর্ষ আদালত মামলার চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণ বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে। বেঞ্চ লক্ষ্য করে, ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে শিশুটির চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়েছিল। সেই পরীক্ষায় কোনও আঘাত, লালচে ভাব বা ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরবর্তী চূড়ান্ত রিপোর্টেও যৌনাঙ্গে প্রবেশের কোনও লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

আদালত আরও উল্লেখ করে, ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির রিপোর্টে শিশুটির পোশাক এবং বাড়ি থেকে জব্দ করা সামগ্রীতে রক্ত বা শুক্রাণুর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে, হাইকোর্ট ট্রায়াল কোর্টের খালাসের সিদ্ধান্ত পাল্টানোর সময় চিকিৎসা রিপোর্ট এবং এফএসএল রিপোর্টের যথাযথ উল্লেখই করেনি। আদালতের মতে, মামলার নথিতে থাকা উপাদানগুলি প্রসিকিউশনের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

এছাড়াও, কথিত ঘটনাস্থল নিয়েও মামলায় অস্পষ্টতা ছিল। তদন্তকারী আধিকারিকের বক্তব্যের সঙ্গে শিশুটির নিজের বক্তব্যের মধ্যে ঘটনাস্থল সম্পর্কিত অসঙ্গতি আদালতের নজরে আসে।

সমস্ত তথ্য ও প্রমাণ বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ট্রায়াল কোর্ট যথাযথভাবেই অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছিল। হাইকোর্ট চিকিৎসা ও ফরেনসিক প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন না করেই সেই সিদ্ধান্ত পাল্টে ভুল করেছে।

ফলে ২০১৬ সালের হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আপিলকারীকে খালাস দেয় সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে তাঁর জামিনের বন্ডও বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার নাম: Ram Singh vs. The State of Himachal Pradesh
মামলা নম্বর: Criminal Appeal No. 1052 of 2016
বিচারপতি: বিচারপতি উজ্জল ভূঁইয়া ও বিচারপতি অতুল এস. চন্দুরকর
রায়ের তারিখ: ১১ আগস্ট, ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button