চোখের চিকিৎসায় বিদেশযাত্রার অনুমতি পেলেন না অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, আবেদন খারিজ আদালতের
মেডিক্যাল বোর্ডের পরীক্ষায় রাজি না হওয়ায় বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দিল না হাইকোর্ট

কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)-র সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করানোর অনুমতির আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। বুধবার (৫ আগস্ট) বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ভারতে চিকিৎসা সম্ভব কি না, তা কোনও স্বাধীন মেডিক্যাল বোর্ডের মতামত ছাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করায় তাঁর আবেদন খারিজ করা হয়েছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেই মামলাগুলির একটিতে আদালত আগেই নির্দেশ দিয়েছিল, আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। সেই কারণেই চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
এর আগে হাইকোর্ট জানিয়ে দিয়েছিল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতামতের ভিত্তিতে যদি প্রমাণিত হয় যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ভারতে সম্ভব নয়, তবেই বিদেশে যাওয়ার অনুমতি বিবেচনা করা হবে। এই শর্তকে চ্যালেঞ্জ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। পরে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টকে এক সপ্তাহের মধ্যে আবেদনটির নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেয় এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব হাইকোর্টের ওপরই ছেড়ে দেয়।
শুনানিতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী রেবেকা জন জানান, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স হাসপাতালে তাঁর চোখের একাধিক অস্ত্রোপচার হয়েছে। একই চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চান তিনি। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা একই বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে চললে রোগীর জন্য তা বেশি উপকারী হয়। পাশাপাশি তিনি আদালতকে জানান, অতীতে বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিবারই নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরে এসেছেন।
অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই আবেদনের বিরোধিতা করা হয়। সরকারের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করেন, এমন কোনও জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যাতে বিদেশে যাওয়াই একমাত্র উপায়। পাশাপাশি তাঁরা জানান, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে চলা একাধিক মামলার তদন্ত এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই এই অবস্থায় তাঁকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।
বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য শুনানির সময় বলেন, আদালত চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নয়। তাই বিদেশে চিকিৎসা সত্যিই অপরিহার্য কি না, তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যে এসএসকেএম হাসপাতালের চক্ষু বিভাগ থেকে তিন সদস্যের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেয় আদালত।
আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ভারতে সম্ভব হয়, তাহলে বিদেশে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। বিচারপতি আরও বলেন, ভারতের চিকিৎসা পরিকাঠামো বর্তমানে অনেক উন্নত হয়েছে। তাই বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে যাচাই হওয়া দরকার।
এছাড়া, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া চিকিৎসকের প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে। আদালতের মতে, ওই প্রতিবেদনে চিকিৎসকের মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন নম্বর বা তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, সেই তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ওই মতামতের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শুনানির সময় আদালত একাধিকবার জানতে চায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রস্তাবিত মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে রাজি কি না। তাঁর আইনজীবী স্পষ্ট জানান, তিনি বিদেশেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে চান এবং ভারতে মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে পরীক্ষা করাতে ইচ্ছুক নন।
এই অবস্থান নথিভুক্ত করে আদালত জানায়, যদি তিনি মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে উপস্থিত হতে সম্মত হতেন, তাহলে সেই বোর্ডের রিপোর্ট বিবেচনা করেই তাঁর বিদেশযাত্রার আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ গ্রহণ না করায় আবেদনটি ঝুলিয়ে রাখার কোনও কারণ নেই।
ফলে আদালত তাঁর বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির আবেদন খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন চিকিৎসক দলের মতামত ছাড়া বিদেশে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিচার করা সম্ভব নয় এবং আবেদনকারী নিজেই সেই পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করেছেন। তাই এই পরিস্থিতিতে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যায় না।
কেস টাইটেল: Abhishek Banerjee vs State of West Bengal & Others (Application for Permission to Travel Abroad for Medical Treatment)


