খবরাখবর

মৃত বাবার জাতি শংসাপত্র না থাকলেও আরটিই ভর্তি বাতিল করা যাবে না: বোম্বে হাইকোর্ট

একক মায়ের বৈধ জাতি সনদই যথেষ্ট, শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের নির্দেশ আদালতের

বোম্বে হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে স্পষ্ট করেছে যে, শুধুমাত্র মৃত বাবার জাতি (কাস্ট) শংসাপত্র দিতে না পারার কারণে কোনও শিশুকে শিক্ষার অধিকার আইন (Right to Education Act বা RTE)-এর আওতায় বিদ্যালয়ে ভর্তি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আদালত বলেছে, যদি শিশুর একমাত্র জীবিত অভিভাবক মা হন এবং তাঁর কাছে বৈধ জাতি সনদ থাকে, তাহলে শুধুমাত্র বাবার জাতি সনদের অভাব দেখিয়ে ভর্তি বাতিল করা আইনসম্মত নয়।

বিচারপতি এন. জে. জামাদারের একক বেঞ্চ পুনের বাসিন্দা রঞ্জনা যোগেশ যাধবের দায়ের করা রিট আবেদন মঞ্জুর করে শিক্ষা দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেয়, রঞ্জনার মেয়ে আরোহী যোগেশ যাধবকে আরটিই কোটায় ভর্তি দিতে হবে এবং মৃত বাবার জাতি সনদ জমা দেওয়ার কোনও শর্ত আরোপ করা যাবে না। আদালত আরও নির্দেশ দেয়, ২০২৬ সালের ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, রঞ্জনা যাধব পুনের একজন গৃহকর্মী এবং একক মা। তিনি তাঁর মেয়ে আরোহীকে পুনের আদিত্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আরটিই কোটায় ভর্তি করানোর জন্য আবেদন করেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আবেদনটি খারিজ করে দেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, শিশুটির প্রয়াত বাবার জাতি সনদ জমা দেওয়া হয়নি।

রঞ্জনা আদালতে জানান, তিনি এবং তাঁর স্বামী—উভয়েই ধাঙ্গর (Dhangar) সম্প্রদায়ভুক্ত, যা মহারাষ্ট্রে স্বীকৃত যাযাবর জনজাতি (Nomadic Tribe)। তাঁর নিজের বৈধ জাতি সনদ থাকলেও তাঁর স্বামী ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে মারা যাওয়ায় তিনি জীবদ্দশায় জাতি সনদ সংগ্রহ করতে পারেননি। তবে তাঁর স্বামীর স্কুল ছাড়ার শংসাপত্রে স্পষ্টভাবে জাতি হিসেবে “ধাঙ্গর” উল্লেখ রয়েছে। সেই নথিও তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছিলেন।

তবুও তালুকা স্তরের স্ক্রুটিনি কমিটি, শিক্ষা আধিকারিক এবং পরে উপ-শিক্ষা পরিচালক আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বাবার সরকারি জাতি সনদ না থাকায় শিশুর জাতিগত পরিচয় প্রমাণিত হয়নি।

এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিচারপতি জামাদার বলেন, বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে প্রশাসনিক বা প্রক্রিয়াগত মনে হলেও বাস্তবে এটি শিশুর সাংবিধানিক শিক্ষা-অধিকার এবং সমতার অধিকারের সঙ্গে জড়িত। আদালতের মতে, মৃত বাবার জাতি সনদের উপর একমাত্র নির্ভর করার যে অবস্থান কর্তৃপক্ষ নিয়েছে, তা অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে অসঙ্গত।

আদালত পর্যবেক্ষণ করে, প্রতিটি ক্ষেত্রে কোনও শিশুর জাতিগত পরিচয় শুধুমাত্র বাবার জাতির ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে—এমন কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে যখন মা-ই একমাত্র স্বাভাবিক অভিভাবক এবং সন্তান মায়ের সামাজিক পরিবেশেই বেড়ে উঠছে, তখন মায়ের জাতি সনদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়েরও উল্লেখ করে বোম্বে হাইকোর্ট।

বিচারপতি জামাদার আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ রঞ্জনার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। বিশেষ করে মৃত স্বামীর স্কুল ছাড়ার শংসাপত্রে তাঁর জাতি “ধাঙ্গর” হিসেবে উল্লেখ ছিল। মামলার শুনানির সময় আদালতের নির্দেশে ওই নথির সত্যতা যাচাই করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় সেটিকে প্রামাণিক বলে নিশ্চিত করে।

আদালতের মতে, এতসব প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র একটি অনুপস্থিত নথিকে কেন্দ্র করে আরটিই কোটায় ভর্তি অস্বীকার করা ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও যান্ত্রিক প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়। এই ধরনের কঠোর প্রক্রিয়াগত অবস্থান শিশুর মৌলিক শিক্ষার অধিকারকে খর্ব করতে পারে, যা সংবিধানের চেতনাবিরোধী।

ফলে বোম্বে হাইকোর্ট উপ-শিক্ষা পরিচালক এবং শিক্ষা আধিকারিকের জারি করা সমস্ত প্রত্যাখ্যানের আদেশ বাতিল করে দেয় এবং আরোহী যোগেশ যাধবকে আরটিই কোটায় অবিলম্বে ভর্তি দেওয়ার নির্দেশ জারি করে।

কেস টাইটেল: Ranjana Yogesh Jadhav v. Principal Secretary, School Education Department & Ors. (Writ Petition No. 7647 of 2026)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button