আদালতের শুনানির খবর প্রকাশে বাধা নেই, স্পষ্ট জানাল সুপ্রিম কোর্ট
অডিও-ভিডিও ক্লিপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বহাল, তবে সংবাদ প্রকাশে কোনও বাধা নয়

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আদালতের কার্যক্রম নিয়ে সংবাদ প্রকাশে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমের উপর কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। আদালতের আগের অন্তর্বর্তী নির্দেশ শুধুমাত্র আদালতের শুনানির অডিও ও ভিডিও রেকর্ডিং ব্যবহার, প্রচার বা বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফলে সংবাদমাধ্যম আগের মতোই আদালতের শুনানি, গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জনগণকে তথ্য জানাতে পারবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্টীকরণ দেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার ডিভিশন বেঞ্চ। ৩১ জুলাই, ২০২৬-এ দেওয়া এই নির্দেশে আদালত জানায়, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা এবং আদালতের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বজায় রেখেই আদালতের অডিও-ভিডিও রেকর্ডিংয়ের অপব্যবহার রোধ করা প্রয়োজন।
মামলার প্রেক্ষাপট
এই মামলাটি দায়ের করেন সাংবাদিক হর্ষিতা গ্রোভার। জনস্বার্থ মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, আদালতের লাইভ-স্ট্রিম হওয়া শুনানির ভিডিও ও অডিও থেকে বিভিন্ন অংশ কেটে, সম্পাদনা করে বা প্রসঙ্গের বাইরে এনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সেই ভিডিও থেকে আর্থিক লাভও করা হচ্ছে। এসব রোধে সুস্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরির আবেদন জানান তিনি।
এর আগে ২৪ জুলাই, ২০২৬-এ সুপ্রিম কোর্ট একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের সেক্রেটারি জেনারেল বা সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের পূর্বানুমতি ছাড়া আদালতের কার্যক্রমের অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং সংগ্রহ, পোস্ট, পুনরায় পোস্ট, আপলোড, সংরক্ষণ, প্রচার বা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না।
যদিও ওই নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছিল যে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যম আদালতের কার্যক্রমের সংবাদ প্রকাশ করতে পারবে, তবুও এই ছাড়ের পরিধি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। সেই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী শুনানিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বেঞ্চ জানায়, আগের নির্দেশকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না যাতে মনে হয় সংবাদমাধ্যম আদালতের কার্যক্রমের খবর প্রকাশ করতে পারবে না।
আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলে, স্বীকৃত সংবাদমাধ্যম আদালতের শুনানির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে, আইনি অগ্রগতি তুলে ধরতে এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তবে সেই প্রতিবেদনে আদালতের শুনানির অডিও বা ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করা যাবে না, যদি না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া হয়।
বিচারপতিরা আরও বলেন, আদালতের কার্যক্রমের সঠিক ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আদালতের ভিডিও বা অডিওর নির্বাচিত অংশ কেটে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই সেই অপব্যবহার রোধ করাই আদালতের মূল উদ্দেশ্য।
আগের নির্দেশে কী বলা হয়েছিল
২৪ জুলাইয়ের অন্তর্বর্তী নির্দেশে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, আদালতের লাইভ-স্ট্রিম হওয়া ভিডিও বা অডিও থেকে অংশবিশেষ কেটে বা সম্পাদনা করে প্রচার করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রকৃত চিত্র বিকৃত হতে পারে। সেই কারণেই অনুমতি ছাড়া আদালতের অডিও-ভিডিও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকগুলির সঙ্গে আলোচনা করে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালা তৈরির প্রস্তাব আদালতে জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব হাইকোর্টকে আদালতের কার্যক্রমের লাইভ স্ট্রিমিং ও রেকর্ডিং সংক্রান্ত মডেল রুলস বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা জানিয়ে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন লাইভ স্ট্রিমিং কতটা বাস্তবসম্মত, তাও ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে।
এছাড়া, এই মামলায় দাখিল হওয়া একাধিক হস্তক্ষেপের আবেদনও গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। আবেদনকারীদের পরবর্তী শুনানিতে আদালতকে সহায়তা করার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, স্বীকৃত সংবাদমাধ্যম আদালতের শুনানি এবং বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আগের মতোই সংবাদ প্রকাশ করতে পারবে। তবে আদালতের অডিও বা ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। অর্থাৎ, সংবাদ প্রকাশে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই, নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র আদালতের রেকর্ড করা অডিও-ভিডিওর অননুমোদিত ব্যবহার ও প্রচারের ওপরই বহাল থাকবে।
মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬।
কেস টাইটেল: Harshita Grover v. Union of India and Others
কেস নম্বর: W.P.(C) No. 751/2026



