সোনম রঘুবংশীর জামিন বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট, আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিল
গ্রেপ্তারের নথির কারিগরি ত্রুটিতে জামিন নয়, জানাল দেশের সর্বোচ্চ আদালত

মেঘালয়ে হানিমুনে গিয়ে স্বামী রাজা রঘুবংশী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সোনম রঘুবংশীর জামিন বাতিল করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, গ্রেপ্তারের কারণ জানানো সংক্রান্ত কিছু কারিগরি ত্রুটিকে ভিত্তি করে নিম্ন আদালত এবং মেঘালয় হাইকোর্ট যে জামিন দিয়েছিল, তা আইনসঙ্গত নয়। ফলে দুই আদালতের আদেশ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট সোনম রঘুবংশীকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে।
বিচারপতি এম. এম. সুন্দরেশ এবং বিচারপতি পি. বি. ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ মেঘালয় সরকারের দায়ের করা বিশেষ অনুমতি আবেদন (SLP) গ্রহণ করে এই নির্দেশ দেয়।
মামলার সূত্রপাত ২০২৫ সালের মে মাসে। অভিযোগ অনুযায়ী, হানিমুন কাটাতে মেঘালয়ে গিয়েছিলেন রাজা রঘুবংশী ও তাঁর স্ত্রী সোনম রঘুবংশী। সেই সফর চলাকালীন রাজা রঘুবংশীর মৃত্যু হয়। তদন্তে সোনম রঘুবংশীকে এই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ২০২৫ সালের ৯ জুন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে সোনম রঘুবংশী জামিনের আবেদন করেন। বিচারিক আদালত (ট্রায়াল কোর্ট) তাঁর জামিন মঞ্জুর করে এই যুক্তিতে যে, তদন্তকারী সংস্থা গ্রেপ্তারের কারণ যথাযথভাবে তাঁকে জানায়নি। পরবর্তীতে মেঘালয় হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, গ্রেপ্তার সংক্রান্ত নথিতে কিছু ত্রুটি ছিল, যার মধ্যে ভুল আইনি ধারার উল্লেখও ছিল।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে মেঘালয় সরকার। রাজ্য সরকারের দাবি ছিল, গ্রেপ্তারের নথিতে কিছু কারিগরি ত্রুটি থাকলেও তা জামিন দেওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে না। বিশেষ করে, সোনম রঘুবংশীর আগের তিনটি জামিনের আবেদন ইতিমধ্যেই মামলার মূল বিষয় বিবেচনা করে খারিজ করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট মামলার শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যা দেয়। আদালত জানায়, গ্রেপ্তারের কারণ একেবারেই না জানানো এবং কারণ জানাতে গিয়ে নথিতে কিছু ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা থাকা—এই দুটি বিষয় এক নয় এবং আইনের দৃষ্টিতে এদের প্রভাবও আলাদা।
আদালত পর্যবেক্ষণে বলে, “এটি এমন কোনও মামলা নয় যেখানে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের কারণ একেবারেই জানানো হয়নি। গ্রেপ্তারের কারণ না জানানো এবং পর্যাপ্ত কারণ সঠিকভাবে উল্লেখ না করার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রথম ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারই অবৈধ হতে পারে, কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেখতে হবে অভিযুক্ত বাস্তবে কোনও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন কি না।”
সুপ্রিম কোর্ট আরও জানায়, সোনম রঘুবংশীকে গ্রেপ্তারের সময় প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ করা হয়েছিল এবং রিমান্ডের সময় ম্যাজিস্ট্রেটও সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে নথিভুক্ত করেছিলেন।
আদালত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বেঞ্চ জানায়, সোনম রঘুবংশী আগেই তিনবার নিয়মিত জামিনের আবেদন করেছিলেন এবং প্রতিবারই তা মামলার মূল বিষয় বিবেচনা করে খারিজ হয়েছিল। কিন্তু গ্রেপ্তারের কারণ জানানো নিয়ে আপত্তি তোলা হয় সেই সব আবেদন খারিজ হওয়ার পর। আদালতের মতে, এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা উপেক্ষা করা যায় না।
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট করে যে, কোনও ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ায় আইনি ত্রুটি থাকলেও, তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে তদন্তকারী সংস্থা নতুন করে গ্রেপ্তার (re-arrest) করতে পারে। আদালত মন্তব্য করে, “গ্রেপ্তারের কারণ জানানো সংক্রান্ত নিয়ম মানা না হলেও, তদন্তের প্রয়োজনে পুনরায় গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আইনি বাধা সৃষ্টি হয় না।”
শুনানির সময় বিচারপতি পি. বি. ভারালে বর্তমান সমাজে তরুণ প্রজন্মের উপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “হোয়াটসঅ্যাপে যা ভাগ করা হচ্ছে, সেটাকেই এখন অনেকেই জ্ঞান বলে ধরে নিচ্ছেন।”
সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট ট্রায়াল কোর্ট এবং মেঘালয় হাইকোর্টের জামিনের আদেশ বাতিল করে সোনম রঘুবংশীকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়।
তবে আদালত তাঁকে একটি সুযোগও দিয়েছে। যদি আগামী ছয় মাসের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হয়, তাহলে তিনি নতুন করে নিয়মিত জামিনের আবেদন করতে পারবেন। সেই আবেদন বিচার করার সময় বর্তমান রায় বা তাঁর আগের জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার বিষয়টি যেন প্রভাব না ফেলে, সে নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
কেস টাইটেল: State of Meghalaya v. Sonam Raghuvanshi @ Bitti @ Bittu (SLP (Crl.) No. 11944 of 2026)



