বিচারপতিকে নিয়ে বিতর্কিত ভিডিও, ইউটিউবারের সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক বহাল দিল্লি হাইকোর্টের
নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ঘোষণা, আদালতে আরও কড়া অবস্থান

বিচারপতিকে নিয়ে দুর্নীতি ও সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ তুলে একের পর এক ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন এক ইউটিউবার। সেই ভিডিওকে প্রাথমিকভাবে আদালত অবমাননাকর এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের সামিল বলে মনে করে দিল্লি হাইকোর্ট। এবার সেই মামলাতেই ইউটিউবারের সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করার আগের নির্দেশ প্রত্যাহারের আবেদন খারিজ করে দিল আদালত। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করা সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত।
বিচারপতি প্রতিভা এম সিং এবং বিচারপতি বিকাশ মহাজনের ডিভিশন বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। মামলাটি দায়ের করেছিল দিল্লি হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। মামলায় ইউটিউবার ড. কপিল কাকার এবং Meta Platforms Inc., Google LLC, X Corp. ও LinkedIn Corporation-এর মতো একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া মধ্যস্থতাকারী সংস্থাকে পক্ষ করা হয়।
মামলার সূত্রে জানা যায়, নিজেকে ‘Black Justice’ নামে একটি ওয়েব সিরিজের প্রযোজক হিসেবে পরিচয় দেওয়া ড. কপিল কাকার ২০২৬ সালের ২, ৪ এবং ৫ জুন একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন। সেই ভিডিওগুলিতে দিল্লি হাইকোর্টের এক কর্মরত সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতিকে নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করা হয়।
ভিডিওগুলিতে বিচারপতির বিরুদ্ধে MCD-র আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ, কর্পোরেট সংস্থার প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং আরও নানা মন্তব্য করা হয়েছিল। এমনকি বিচারপতিকে ‘murderer’ এবং ‘habitual offender’ বলেও উল্লেখ করা হয়। সাকেত এলাকায় একটি ভবন ধসে পড়ার ঘটনার সঙ্গেও বিচারপতিকে জড়িয়ে মন্তব্য করা হয়েছিল।
এই ভিডিওগুলির বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর দিল্লি হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ৮ জুন ২০২৬ ফৌজদারি আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করে। একই সঙ্গে BNSS-এর ৫২৮ ধারায় একটি আবেদন করে দ্রুত ভিডিও সরানো এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করার আবেদন জানানো হয়।
৮ জুনের নির্দেশে দিল্লি হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলিকে ওই ভিডিওগুলি হোস্ট বা প্রচার না করার নির্দেশ দেয়। নির্দিষ্ট URL সরানোর পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ড. কাকার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর সাবস্ক্রাইবার সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
আগের নির্দেশে আদালত জানিয়েছিল, ভিডিওগুলির বিষয়বস্তু প্রাথমিকভাবে কেলেঙ্কারিমূলক এবং বিচারব্যবস্থার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের সামিল।
এরপর ১২ জুন একটি স্পষ্টীকরণমূলক নির্দেশ দেওয়া হয়। কারণ, ওই সময়ের মধ্যে ড. কাকার আরও একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে। সেখানে তিনি আদালত অবমাননার মামলার নোটিশ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন এবং তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশে বলেন, অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার আগে যেন তাঁরা সংশ্লিষ্ট ভিডিওগুলি ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করেন।
শুধু তাই নয়, আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তিনি নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। ফলে আদালত আরও কিছু URL-এর তালিকা আগের নির্দেশের সঙ্গে যুক্ত করে।
পরবর্তী সময়ে ড. কাকার পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করার নির্দেশ প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়। পাশাপাশি বেঞ্চের বিচারপতিদের একাংশের বিরুদ্ধে recusal-এর আবেদনও করা হয়েছিল, যদিও পরে সেই আবেদন আর চাপানো হয়নি।
বর্তমান বেঞ্চ নিজে সংশ্লিষ্ট তিনটি ভিডিও দেখে আগের আদালতের প্রাথমিক মূল্যায়নকে যথাযথ বলে মনে করেছে। আদালত মনে করেছে, ভিডিওগুলির বক্তব্য prima facie আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়তে পারে।
আদালত আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে জানিয়েছে, শুধু নির্দিষ্ট ভিডিওগুলি সরিয়ে দেওয়া যথেষ্ট কি না, নাকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করা প্রয়োজন—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁর পরবর্তী আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের মতে, নোটিশ পাওয়ার পরও তিনি যে নতুন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একই ধরনের বিষয় ছড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং অনুসারীদের ভিডিও সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেটিই blanket blocking-এর প্রয়োজনীয়তার যথেষ্ট কারণ।
অর্থাৎ, আদালত শুধু প্রকাশিত ভিডিওর বিষয়বস্তু নয়, আদালতের নির্দেশের পর অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রক্রিয়াগত আপত্তির ক্ষেত্রেও আদালত ড. কাকার যুক্তি গ্রহণ করেনি। আদালত জানিয়েছে, Contempt of Courts Act, 1971-এর ১৫ ধারার অধীনে Standing Counsel (Criminal)-এর সম্মতি এবং প্রয়োজনীয় হলফনামা নথিতে ছিল। যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দেওয়া আগাম কপিতে সেগুলি ছিল না, প্রথম শুনানিতে তিনি উপস্থিত না থাকায় সেই আপত্তি পরবর্তী সময়ে গ্রহণযোগ্য নয় বলে আদালত মনে করেছে।
শেষ পর্যন্ত ড. কাকার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্লক করার আগের নির্দেশ প্রত্যাহারের আবেদন খারিজ করে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট। মধ্যস্থতাকারী সংস্থাগুলি নির্দেশ মেনে কাজ করেছে বলে আদালতকে জানায়। ভবিষ্যতে নতুন কোনও URL সামনে এলে তা Registrar General-কে জানিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তা সরানোর নির্দেশও বহাল রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে আদালত Contempt of Courts Act, 1971-এর ১৫ ধারায় মামলাটি গ্রহণ করে দিল্লি হাইকোর্টের ২০২৫ সালের Contempt of Courts Rules-এর Rule 10 অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক show cause notice জারির নির্দেশ দিয়েছে। ড. কাকার জবাব দেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে। মামলাটি এবং discharge application আগামী ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছে।
এই রায়ের মাধ্যমে দিল্লি হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছে, আদালত অবমাননার অভিযোগে শুধু আপত্তিকর কনটেন্ট সরানোই সবসময় যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যদি আদালতের নির্দেশ এড়িয়ে একই কনটেন্ট নতুন অ্যাকাউন্টে ছড়ানোর চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁর সম্পূর্ণ সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতির ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা যেতে পারে।



