সুপ্রিমকোর্ট

ডিম ছোড়ার আশঙ্কায় তদন্ত এড়ানো নয়, মহুয়া মৈত্রকে সুপ্রিম কোর্ট

সাংসদের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা মানলেও ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদন খারিজ আদালতের

তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে সশরীরে হাজির না হয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তদন্তে অংশ নেওয়ার অনুমতি চেয়ে করা তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্রের আবেদন গ্রহণ করল না সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার, ৭ আগস্ট মামলাটি শুনে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, শুধুমাত্র বিক্ষোভ বা প্রতিবাদের আশঙ্কার কারণে কোনও জনপ্রতিনিধি তদন্তে সশরীরে হাজির হওয়া এড়িয়ে যেতে পারেন না।

মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কথিত উস্কানিমূলক মন্তব্য করার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছিল। এই মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে অন্তর্বর্তী গ্রেফতারির সুরক্ষা দিয়েছিল। একই সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়ে ১৪ আগস্ট ২০২৬ তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে তাঁকে হাজির হতে বলা হয়েছিল।

হাইকোর্ট পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকেও তাঁর হাজিরার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশের বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন মহুয়া মৈত্র।

মামলার পটভূমি

মামলার সূত্রপাত একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগে বলা হয়, ফেসবুকে প্রকাশিত কয়েকটি ভিডিওতে মহুয়া মৈত্রের বক্তব্য উস্কানিমূলক ছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে FIR দায়ের করে পুলিশ।

এরপর বিষয়টি কলকাতা হাইকোর্টে যায়। হাইকোর্ট তাঁকে অন্তর্বর্তীভাবে গ্রেফতারি থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে একই সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ১৪ আগস্ট ২০২৬ মহুয়া মৈত্রকে তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজির হতে হবে। তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেয় আদালত।

কিন্তু সশরীরে হাজির হওয়ার এই নির্দেশ নিয়ে আপত্তি জানান তৃণমূল সাংসদ। তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে তদন্তকারী আধিকারিকের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলার অনুমতি চান।

কেন ভার্চুয়াল হাজিরা চেয়েছিলেন মহুয়া?

মহুয়া মৈত্রের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেন সিনিয়র অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করনারায়ণন। তিনি আদালতকে জানান, মহুয়া মৈত্রের আশঙ্কা রয়েছে যে পুলিশ স্টেশনে হাজির হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হতে পারে।

আইনজীবী আগের কিছু ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, এর আগে পুলিশ স্টেশনে যাওয়ার সময় মহুয়া মৈত্রের দিকে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটেছিল।

এই কারণেই তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে তাঁকে শারীরিকভাবে হাজির না করিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আবেদন করা হয়।

তবে এই যুক্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ সন্তুষ্ট হয়নি।

আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ

মামলাটি শুনছিলেন বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি শীল নাগুর বেঞ্চ।

শুনানির সময় বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত মহুয়া মৈত্রের সাংসদ পরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করেন, রাজনীতিতে এসে একজন জনপ্রতিনিধি কীভাবে বিক্ষোভ বা ডিম ছোড়ার আশঙ্কার কারণে তদন্তে হাজিরা এড়াতে পারেন?

বিচারপতি দত্ত বলেন, “You are a Member of Parliament. Having taken the plunge into politics, you fear eggs? When our freedom fighters have taken bullets on their chest?”

এরপর তিনি আরও বলেন, এই ধরনের আবেদন সুপ্রিম কোর্টে আসাই উচিত নয়।

মহুয়া মৈত্রের আইনজীবী যখন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তদন্ত চালানোর যুক্তি দেন, তখন বেঞ্চ প্রশ্ন করে, “Why virtually? Because you are an MP?”

অর্থাৎ, তিনি সাংসদ বলেই কেন তাঁকে ভার্চুয়ালি তদন্তে অংশ নেওয়ার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত।

হাইকোর্টের নির্দেশই বহাল

সুপ্রিম কোর্ট মনে করিয়ে দেয়, কলকাতা হাইকোর্ট ইতিমধ্যেই মহুয়া মৈত্রকে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছে। সেই নির্দেশ অনুযায়ী তাঁকে তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে হাজির হতে হবে।

আদালত আরও জানায়, তিনি যদি হাজির না হন, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ফল তাঁকে কলকাতা হাইকোর্টের সামনে গিয়ে মোকাবিলা করতে হবে।

এরপর মহুয়া মৈত্রের হয়ে সওয়াল করা সিনিয়র অ্যাডভোকেট গোপাল শঙ্করনারায়ণন আবেদনটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনুমতি চান।

সুপ্রিম কোর্ট সেই আবেদন মঞ্জুর করে এবং মামলাটি withdrawn বা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে নিষ্পত্তি করে।

ফলে কলকাতা হাইকোর্টের আগের নির্দেশই বহাল থাকল। অর্থাৎ ১৪ আগস্ট ২০২৬ মহুয়া মৈত্রকে তদন্তকারী আধিকারিকের সামনে সশরীরে হাজির হয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।

এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে নতুন কোনও গ্রেফতারি সুরক্ষা দেয়নি বা তদন্তের পদ্ধতি পরিবর্তনের নির্দেশও দেয়নি। একই সঙ্গে মহুয়া মৈত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশও কার্যকর থাকবে।

কেস টাইটেল

Mahua Moitra v. The State of West Bengal and Others

কেস নম্বর: SLP (Crl.) No. 14405 of 2026 (Diary No. 47058 of 2026)
বিচারপতি: Justice Dipankar Datta and Justice Sheel Nagu
রায়ের তারিখ: ৭ আগস্ট ২০২৬

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button