সুপ্রিমকোর্ট

সহ-অভিযুক্তের সাক্ষ্য সবসময় গ্রহণযোগ্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ রায় সুপ্রিম কোর্টের

ধারা ২৯৯-এর বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া না মানলে আগের সাক্ষ্য ব্যবহার করা যাবে না

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে স্পষ্ট করে দিয়েছে, কোনও সহ-অভিযুক্তের বিচারের সময় রেকর্ড করা সাক্ষ্য পরে গ্রেফতার হওয়া অন্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহার করা যাবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ২৯৯ ধারা অনুযায়ী আদালত আগে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করলে সেই সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে না। এই নীতির ভিত্তিতেই ১৯৯৯ সালের একটি হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত মহেন্দ্র সিংকে খালাস দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ জানিয়েছে, কোনও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য ব্যবহার করার আগে তাকে সাক্ষীকে জেরা করার সুযোগ দেওয়া একটি মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আইন যে সীমিত ব্যতিক্রমের সুযোগ দিয়েছে, তা কঠোরভাবে অনুসরণ করলেই কেবল সেই অধিকার থেকে ব্যতিক্রম করা সম্ভব।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ১ এপ্রিল ছত্তীসগড়ে এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। একজন অভিযুক্তের বিচার তখনই শুরু হলেও মহেন্দ্র সিং দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন বলে অভিযোগ। প্রায় ১৮ বছর পরে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে পৃথকভাবে বিচার শুরু হয়।

প্রথম বিচারে সহ-অভিযুক্ত খালাস পান। সেই বিচার চলাকালীন মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শী (PW-1) আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু মহেন্দ্র সিংয়ের বিচার শুরু হওয়ার আগেই ওই সাক্ষীর মৃত্যু হয়। ফলে ট্রায়াল কোর্ট আগের বিচারে দেওয়া তাঁর সাক্ষ্যকেই প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করে মহেন্দ্র সিংকে দোষী সাব্যস্ত করে। পরে হাই কোর্টও সেই রায় বহাল রাখে।

এরপর মহেন্দ্র সিং সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওই সাক্ষ্য আইনত ব্যবহার করা যায় না, কারণ ফৌজদারি কার্যবিধির ২৯৯ ধারার বাধ্যতামূলক শর্তগুলি কখনওই পালন করা হয়নি।

মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ২৯৯ ধারার উদ্দেশ্য ও পরিধি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে। আদালত জানায়, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক অভিযুক্তেরই প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের জেরা করার অধিকার রয়েছে। ২৯৯ ধারা এই সাধারণ নিয়মের একটি সীমিত ব্যতিক্রম মাত্র।

আদালত আরও জানায়, এই ধারার অধীনে কোনও সাক্ষ্য রেকর্ড করার আগে ট্রায়াল কোর্টকে দুটি বিষয়ে স্পষ্টভাবে সন্তুষ্ট হতে হবে। প্রথমত, অভিযুক্ত সত্যিই পলাতক। দ্বিতীয়ত, অদূর ভবিষ্যতে তাকে গ্রেফতার করার কোনও বাস্তব সম্ভাবনা নেই। এই দুই শর্ত একসঙ্গে পূরণ হলেই কেবল আদালত ২৯৯ ধারা প্রয়োগ করতে পারে এবং সেই বিষয়ে লিখিত আদেশ দিতে হয়।

বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেছে, “কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া সাক্ষীকে জেরা করার অধিকার একটি অবিচ্ছেদ্য ও অ-আলোচনাযোগ্য অধিকার।” আদালত আরও স্পষ্ট করে যে, ২৯৯ ধারার অধীনে রেকর্ড করা সাক্ষ্যও পরবর্তী সময়ে তখনই ব্যবহার করা যাবে, যখন সাক্ষীর মৃত্যু হয়েছে, তিনি সাক্ষ্য দিতে অক্ষম হয়েছেন, তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না অথবা যুক্তিসঙ্গতভাবে আদালতে হাজির করা সম্ভব নয়।

বর্তমান মামলায় সুপ্রিম কোর্ট দেখতে পায়, ১৯৯৯ সালে মামলাটি সেশন আদালতে পাঠানোর সময় কিংবা সহ-অভিযুক্তের বিচার শুরু হওয়ার আগে কোনও পর্যায়েই ২৯৯ ধারার অধীনে প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করা হয়নি। ফলে পরে সাক্ষীর মৃত্যু হলেও তাঁর আগের সাক্ষ্য মহেন্দ্র সিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আইনি ভিত্তি ছিল না।

আদালত আরও উল্লেখ করে, পরবর্তী বিচারে উপস্থিত অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা হয় শত্রুভাবাপন্ন (হোস্টাইল) হয়ে যান, অথবা তাঁরা মহেন্দ্র সিংকে শনাক্ত করতে পারেননি। ফলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আর অবশিষ্ট ছিল না।

এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, প্রসিকিউশন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই মহেন্দ্র সিংকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়। তিনি যদি এখনও কারাগারে থাকেন, তবে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যদি জামিনে থাকেন, তবে তাঁর জামিনের বন্ড বাতিল বলে গণ্য হবে। মামলার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য বিচারাধীন আবেদনও নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

কেস টাইটেল: Mahendra Singh v. State of Chhattisgarh

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button