হাইকোর্ট

দাম্পত্যে বিচ্ছেদের পর ফের একসঙ্গে থাকা মানেই আগের নিষ্ঠুরতার ক্ষমা নয়

পরিস্থিতি না দেখে কয়েক দিনের সহবাসকে ক্ষমা হিসেবে ধরা যাবে না, জানাল কলকাতা হাইকোর্ট

দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রী কয়েকবার একসঙ্গে থাকলেই আগের মানসিক নির্যাতন বা নিষ্ঠুরতা ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এমনই পর্যবেক্ষণ করেছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অতীতের নিষ্ঠুরতা ক্ষমা বা ‘কনডোন’ করা হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হলে শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গোটা দাম্পত্য সম্পর্কের পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, বিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রী মাঝেমধ্যে একসঙ্গে থাকলেই আগের অভিযোগগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যায় না।

মামলার সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের ১৮ জুন স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের অধীনে ওই দম্পতির বিয়ে হয়। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে তাঁদের একটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু দাম্পত্য জীবনে নানা সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ২০১৪ সালে তাঁরা আলাদা হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে স্বামী মানসিক নিষ্ঠুরতার অভিযোগ তুলে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করেন।

পরিবার আদালত শেষ পর্যন্ত স্বামীর পক্ষে বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রি দেয়। সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন স্ত্রী।

স্ত্রীর বক্তব্য ছিল, বিচ্ছেদের পরও তিনি একাধিকবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন। প্রতিবার প্রায় সাত থেকে আট দিন করে স্বামীর সঙ্গে থেকেছেন। তাঁর দাবি, এই আচরণ থেকেই বোঝা যায় যে তিনি সংসার চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর যুক্তি ছিল, যদি স্বামী তাঁর সঙ্গে আবার বসবাস করেন, তাহলে অতীতে ঘটে যাওয়া কথিত নিষ্ঠুরতাও তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন বলে ধরে নিতে হবে।

তবে হাইকোর্ট সেই যুক্তি গ্রহণ করেনি।

আদালত এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায় Dr. N.G. Dastane v. Mrs. S. Dastane-এর নীতি অনুসরণ করে। আদালত ব্যাখ্যা করে, ‘কনডোনেশন’ বা নিষ্ঠুরতার ক্ষমা শুধু ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে থাকতে হবে স্বামী বা স্ত্রীকে আগের দাম্পত্য অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ও।

ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানায়, “স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে থাকার বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলি নিষ্ঠুরতার ক্ষমা হিসেবে গণ্য হয় না।”

অর্থাৎ, বিচ্ছেদের পর কয়েক দিনের জন্য একসঙ্গে থাকা বা স্বামী-স্ত্রীর মতো আচরণ করা মানেই অতীতের সমস্ত অভিযোগ শেষ হয়ে গেল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। বরং আদালতকে দেখতে হবে, সেই সময়কার সামগ্রিক পরিস্থিতি কী ছিল এবং সম্পর্কটি সত্যিই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছিল কি না।

আদালত আরও জানায়, কোনও নিষ্ঠুরতা ক্ষমা করা হলেও সেই ক্ষমা একটি শর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পরবর্তীতে অভিযুক্ত স্বামী বা স্ত্রী আবার নিষ্ঠুর আচরণ করলে আগের ক্ষমার বিষয়টি আর একইভাবে কার্যকর থাকে না।

মামলায় স্ত্রীর স্বামীর বিরুদ্ধে এবং স্বামীর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের কথাও আদালতের সামনে আসে। এর মধ্যে পণ, সম্পত্তি এবং তাঁদের সন্তানের সঙ্গে কথিত দুর্ব্যবহারের মতো অভিযোগ ছিল। কিন্তু আদালত দেখতে পায়, গুরুতর কিছু অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট সমর্থনকারী বা corroborating material ছিল না।

হাইকোর্টের মতে, এমন গুরুতর এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ, যা অন্য পক্ষের মনে গভীর মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করতে পারে, পরিস্থিতি অনুযায়ী মানসিক নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

এই মামলায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দীর্ঘ বিচ্ছেদ। আদালত লক্ষ্য করে, স্বামী-স্ত্রী ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে আলাদা বসবাস করছেন। আদালতের নির্দেশে তাঁদের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টাও হয়েছিল। কিন্তু সেই mediation শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

সব দিক বিবেচনা করে কলকাতা হাইকোর্ট স্ত্রী যে আপিল করেছিলেন, তা খারিজ করে দেয়। একই সঙ্গে কলকাতার ফ্যামিলি কোর্টের দেওয়া বিবাহবিচ্ছেদের ডিক্রিও বহাল রাখে। অতিরিক্ত প্রমাণ আদালতে আনার জন্য করা আবেদনও খারিজ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ডিক্রি অব ডিভোর্সের মাধ্যমে ওই দম্পতির বিবাহিত সম্পর্কের অবসান বহাল রাখে হাইকোর্ট।

এই রায়ের মূল বার্তা হল—বিচ্ছেদের পর স্বামী-স্ত্রীর কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সহবাসকে একা দেখে অতীতের দাম্পত্য নিষ্ঠুরতাকে ক্ষমা করা হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। সম্পর্কের সামগ্রিক পরিস্থিতি, অভিযোগের প্রকৃতি, পরবর্তী আচরণ এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা—সবকিছু বিবেচনা করেই আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button