হাইকোর্ট

বিয়ে বৈধ না হলেও ৪৯৮এ মামলা চলবে, গুরুত্বপূর্ণ রায় কলকাতা হাইকোর্টের

স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাসের প্রাথমিক প্রমাণ থাকলেই চলবে মামলা, বলল আদালত

কলকাতা হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে জানিয়েছে, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারায় মামলা করার জন্য সবসময় আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধ ও প্রথাগত বিয়ে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। কোনও পুরুষ ও মহিলা যদি স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্কে বসবাস করেছেন, এবং তদন্তে তার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে ৪৯৮এ ধারায় ফৌজদারি মামলা চলতে পারে।

বিচারপতি উদয় কুমার, শেখ আজহারউদ্দিন ওরফে আকাশের দায়ের করা ফৌজদারি রিভিশন পিটিশন খারিজ করে এই নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের মতে, এই পর্যায়ে মামলাটি বাতিল করার মতো কোনও ব্যতিক্রমী কারণ নেই।

মামলার সূত্রপাত ২০২২ সালে। বর্ধমান থানায় দায়ের হওয়া Case No. 587 of 2022 এবং G.R. Case No. 2793 of 2022-কে কেন্দ্র করে এই মামলা। অভিযোগকারী কইয়েল বেগম ওরফে জয়া রায়ের দাবি, অভিযুক্ত নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর অভিযুক্তের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২ জুলাই, ২০২০ তাঁদের মধ্যে মুসলিম রীতি অনুযায়ী বিয়ে হয়। এরপর তাঁরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন।

কিন্তু পরে অভিযোগকারী জানতে পারেন, অভিযুক্ত আগে থেকেই বিবাহিত ছিলেন। এরপর দু’জনের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। অভিযোগকারীর দাবি, তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১ মে, ২০২২ তাঁকে তাঁদের একসঙ্গে থাকা বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের পর ৯৮৪ নম্বর চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। সেখানে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ, ৪২০ এবং ৩৮৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

অভিযুক্তের পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে যুক্তি দেওয়া হয়, তাঁদের মধ্যে আইনত বৈধ বিয়ে না হওয়ায় ৪৯৮এ ধারা প্রয়োগ করা যায় না। অভিযোগকারীর আগের বিয়ের কথাও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি, কথিত মুসলিম বিয়ের কোনও নথিভুক্ত প্রমাণ নেই বলেও দাবি করা হয়। এই যুক্তি অবশ্য গ্রহণ করেনি হাইকোর্ট।

আদালত সুপ্রিম কোর্টের Dr. Lokesh B.H. & Ors. v. State of Karnataka & Anr. এবং Reema Aggrawal v. Anupam মামলার রায়ের উপর নির্ভর করে জানায়, ৪৯৮এ ধারায় ‘husband’ শব্দটির অর্থ সবসময় শুধুমাত্র প্রযুক্তিগতভাবে বৈধ বিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।

আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, “A formal, traditional marriage is not an indispensable prerequisite for the maintenance of a prosecution under Section 498A of the IPC.” অর্থাৎ, ৪৯৮এ ধারায় মামলা চালানোর জন্য আনুষ্ঠানিক, প্রথাগত বিয়ে থাকা অপরিহার্য শর্ত নয়।

মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাড়িওয়ালা মহম্মদ মির্জার বক্তব্য। তিনি পুলিশকে জানান, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী তাঁর ভাড়া দেওয়া বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করতেন। অভিযোগকারীর বাবা-মায়ের বক্তব্যও পুলিশের তদন্তে অভিযোগের পক্ষে যায়।

হাইকোর্টের মতে, এই তথ্যগুলি অন্তত প্রাথমিকভাবে একটি মামলা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট।

তবে আদালত একইসঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে, এই পর্যায়ে Section 482 CrPC ব্যবহার করে কোনও ফৌজদারি মামলার পূর্ণাঙ্গ বিচার করা যায় না। অর্থাৎ, আদালত ‘মিনি ট্রায়াল’ করতে পারে না।

অভিযোগকারীর আগের বিয়ে, তাঁর ধর্মান্তর, কথিত মুসলিম বিয়ের বৈধতা এবং দু’জনের সম্পর্কের প্রকৃতি—এই সমস্ত বিষয়ই বিতর্কিত তথ্য। এগুলির সত্যতা প্রমাণের জন্য সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারপর্ব প্রয়োজন।

ফলে বিচারপতি উদয় কুমার মনে করেন, মামলাটি প্রাথমিক পর্যায়ে আইনত গ্রহণযোগ্য এবং চার্জশিট বাতিল করার মতো কোনও ব্যতিক্রমী কারণ নেই।

এরপর কলকাতা হাইকোর্ট C.R.R. No. 1457 of 2024 খারিজ করে দেয়। আগে দেওয়া অন্তর্বর্তী নির্দেশ থাকলে সেগুলিও বাতিল করা হয়েছে। কোনও পক্ষের উপর খরচ চাপানো হয়নি। পাশাপাশি, দুই পক্ষের আইনি অধিকার ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা বজায় রেখে ট্রায়াল কোর্টকে দ্রুত মামলা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

কেস টাইটেল

Sk. Azharuddin @ Akash v. State of West Bengal & Anr.

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button