শিশু নির্যাতনের শিকার হলেও পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না, সংবাদপত্রের সম্পাদক-সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা খারিজে অনীহা কর্ণাটক হাইকোর্টের
Girish Patil & Anr. v. State of Karnataka & Anr.

শিশুর ন্যায়বিচারের স্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করা হলেও তার পরিচয় প্রকাশ করা আইনসম্মত নয় বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে কর্ণাটক হাইকোর্ট। আদালত জানিয়েছে, জুভেনাইল জাস্টিস (কেয়ার অ্যান্ড প্রোটেকশন অব চিলড্রেন) অ্যাক্ট, ২০১৫-এর ৭৪ ধারার সুরক্ষা বাধ্যতামূলক। কোনও সংবাদ প্রতিবেদন যদি এমন তথ্য প্রকাশ করে, যার মাধ্যমে কোনও শিশুর পরিচয় জানা সম্ভব হয়, তাহলে শুধুমাত্র “শিশুর স্বার্থে” বা “ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে” প্রকাশ করা হয়েছে—এই যুক্তিতে আইনের দায় এড়ানো যাবে না।
বিচারপতি অনন্ত রমনাথ হেগড়ে ৩০ জুন ২০২৬ এই রায় দেন। তিনি গিরিশ পাটিল এবং অশোক মহাবলেশ্বর হাস্যাগারা নামে এক সাংবাদিক ও একটি কন্নড় দৈনিকের সম্পাদকের দায়ের করা ফৌজদারি আবেদন খারিজ করে দেন।
মামলার পটভূমি
আবেদনকারীরা ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৮২ ধারার অধীনে কর্ণাটক হাইকোর্টে আবেদন করে দান্ডেলির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফার্স্ট ক্লাস (JMFC) আদালতে চলা ফৌজদারি মামলা বাতিলের আবেদন জানান।
মামলাটি ক্রাইম নং ০৬/২০২১-এর ভিত্তিতে দায়ের হয়। অভিযোগ, তাঁরা জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের ৭৪(১) ধারা লঙ্ঘন করে এমন তথ্য প্রকাশ করেছেন, যার মাধ্যমে এক শিশু নির্যাতনের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ্যে চলে আসে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০ জানুয়ারি ২০২০ একটি কন্নড় দৈনিকে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, এক স্কুলশিক্ষক এক শিশুকে মারধর করেছিলেন। ওই দিনই শিশুটির বাবা পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন এবং তার ভিত্তিতে এফআইআর নথিভুক্ত হয়। তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করে জানায়, সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে শিশুর পরিচয় প্রকাশের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের দাবি
হাইকোর্টে আবেদনকারীদের বক্তব্য ছিল, সংবাদটি প্রকাশের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ঘটনাটি জনসমক্ষে আনা এবং শিশুর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। তাঁদের দাবি, শিশুর সম্মানহানি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। তাই জুভেনাইল জাস্টিস আইনের ৭৪ ধারার শাস্তিমূলক বিধান তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়।
অন্যদিকে, রাজ্যের পক্ষ থেকে এই যুক্তির বিরোধিতা করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
বিচারপতি অনন্ত রমনাথ হেগড়ে আইনটির ৭৪ ধারা বিশ্লেষণ করে বলেন, এই ধারা স্পষ্টভাবে সংবাদপত্র, সাময়িকী, টেলিভিশন, ডিজিটাল বা অন্য কোনও যোগাযোগমাধ্যমে এমন কোনও তথ্য প্রকাশ নিষিদ্ধ করেছে, যা কোনও শিশুর পরিচয় প্রকাশ করতে পারে।
আদালত জানায়, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুদের ক্ষেত্রেই নয়; বরং সুরক্ষা ও যত্নের প্রয়োজন রয়েছে এমন শিশু, অপরাধের শিকার শিশু কিংবা মামলার সাক্ষী শিশু—সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
বিচারপতি বলেন, কোনও শিশু যদি অপরাধের শিকারও হয়, তাহলেও তার নাম, ঠিকানা, বিদ্যালয়ের নাম বা এমন কোনও তথ্য প্রকাশ করা যাবে না, যা থেকে তার পরিচয় জানা সম্ভব।
আদালত আবেদনকারীদের এই যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করে যে, শিশুর স্বার্থে সংবাদ প্রকাশ করায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা চলতে পারে না। আদালতের মতে, আইনে এমন কোনও ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। বরং আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যই হলো শিশুদের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করে, কোনও ঘটনার ব্যাপক প্রচার সবসময় শিশুর কল্যাণে আসে না। প্রত্যেক শিশু ভিন্নভাবে সামাজিক প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করে। ফলে পরিচয় প্রকাশ পেলে তা শিশুর মানসিক, সামাজিক ও ভবিষ্যৎ জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণেই আইন শিশুদের পরিচয় গোপন রাখার বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সব দিক বিবেচনা করে কর্ণাটক হাইকোর্ট আবেদনকারীদের ফৌজদারি মামলা বাতিলের আবেদন খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, ট্রায়াল কোর্টে জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্টের ৭৪(১) ধারার অধীনে যে ফৌজদারি মামলা চলছে, তা আইন অনুযায়ী চলবে এবং এই পর্যায়ে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করার কোনও কারণ দেখছে না।
এই রায় শিশুদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব ও আইনি সীমারেখা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



