হাইকোর্ট

জনসমক্ষে না হলে এসসি-এসটি আইনের অভিযোগ টিকবে না: দিল্লি হাইকোর্ট

ব্যক্তিগত অফিসে মন্তব্যেই মামলা নয়, আইনের শর্ত মানা জরুরি বলল আদালত

দিল্লি হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে জানিয়েছে, তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইন, ১৯৮৯-এর অধীনে মামলা টিকিয়ে রাখতে হলে অভিযোগে উল্লেখিত জাতিগত অপমান বা ভয় দেখানোর ঘটনা অবশ্যই “জনসমক্ষে” (within public view) ঘটতে হবে। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অফিস কক্ষে এমন মন্তব্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ থাকলেই এই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা প্রযোজ্য হবে না। এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আদালত ট্রান্স ওয়ার্ল্ড রেডিও ইন্ডিয়ার (Trans World Radio India) চারজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসসি-এসটি আইনের অধীনে অভিযোগ গঠনের নির্দেশ বাতিল করেছে।

তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC)-এর অধীনে যে অভিযোগগুলি রয়েছে, সেগুলির বিষয়ে কোনও মতামত প্রকাশ করা হয়নি। সেই অভিযোগগুলি নতুন করে আইন অনুযায়ী বিবেচনার জন্য মামলাটি ট্রায়াল কোর্টে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

বিচারপতি মধু জৈনের একক বেঞ্চ এই রায় দেয় একটি ২০১২ সালের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া আবেদনের শুনানিতে।

মামলার সূত্রপাত ট্রান্স ওয়ার্ল্ড রেডিও ইন্ডিয়ার কয়েকজন সাফাই কর্মীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, সংস্থার চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাঁদের জাতিগত পরিচয় নিয়ে অপমান করেছেন, বৈষম্য করেছেন, খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ দিয়েছেন এবং চাকরি নিয়ে হুমকি দিয়েছেন।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে সাকেত আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও সেশন বিচারক ২০১২ সালের ২২ মার্চ এসসি-এসটি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের ৩(১)(x) ধারায় অভিযোগ গঠনের নির্দেশ দেন।

এর বিরুদ্ধে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, অভিযোগে এই ধারার অপরিহার্য আইনি উপাদানগুলি নেই। তাঁরা আরও জানান, প্রথম দিকের অভিযোগগুলিতে মূলত ধর্মান্তরের জন্য চাপ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের কথা বলা হলেও, পরবর্তী অভিযোগে প্রথমবার জাতিগত অপমানের বিষয়টি যোগ করা হয়। পাশাপাশি পুলিশের স্ট্যাটাস রিপোর্টেও বলা হয়েছিল, তদন্তে এই অভিযোগগুলির সমর্থনে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মামলার শুনানিতে বিচারপতি মধু জৈন বলেন, অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে আদালত বিস্তারিতভাবে প্রমাণের মূল্যায়ন করবে না। কিন্তু অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রতিটি অপরিহার্য আইনি উপাদান রয়েছে কি না, তা অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে।

আদালত উল্লেখ করে, ২০১৫ সালের সংশোধনের আগে এসসি-এসটি আইনের ৩(১)(x) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা ছিল, অভিযোগে উল্লিখিত অপমান বা ভয় দেখানোর ঘটনা “যে কোনও জনসমক্ষে দৃশ্যমান স্থানে” (within public view) ঘটতে হবে।

এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের Hitesh Verma v. State of Uttarakhand এবং Ramesh Chandra Vaishya v. State of Uttar Pradesh মামলার রায়েরও উল্লেখ করে দিল্লি হাইকোর্ট। আদালত জানায়, কোনও ব্যক্তিগত ভবন বা অফিসের ভিতরে জাতিগত মন্তব্য করা হয়েছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসসি-এসটি আইনের এই ধারা প্রযোজ্য হবে না। সেই সময় সেখানে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বা জনসমক্ষে ঘটনাটি ঘটার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া জরুরি।

বিচারপতি জৈন পর্যবেক্ষণে বলেন, “ঘটনাটি জনসমক্ষে ঘটতে হবে—এটি এই অপরাধের একটি বাধ্যতামূলক আইনি শর্ত। এই শর্ত উপেক্ষা করা যায় না।”

অভিযোগপত্র খতিয়ে দেখে আদালত লক্ষ্য করে, অভিযোগকারীরাই বলেছেন যে, সংশ্লিষ্ট মন্তব্যগুলি অভিযুক্তদের নিজ নিজ অফিস কক্ষের ভিতরে করা হয়েছিল। কিন্তু কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে, সেই সময় কোনও স্বাধীন সাধারণ ব্যক্তি বা বাইরের কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

আদালত আরও বলে, “অভিযোগপত্রের নিজস্ব বক্তব্য থেকেই প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয় না যে, কথিত জাতিগত অপমান বা ভয় দেখানোর ঘটনা জনসমক্ষে ঘটেছিল।”

বিচারপতি জৈন আরও মন্তব্য করেন, সাধারণভাবে বিতর্কিত তথ্যের নিষ্পত্তি বিচার চলাকালীন হয়। তবে অভিযোগপত্রেই যদি অপরাধের মৌলিক আইনি উপাদান অনুপস্থিত থাকে, তাহলে কোনও অভিযুক্তকে অযথা বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা যায় না।

এই যুক্তির ভিত্তিতে দিল্লি হাইকোর্ট ২০১২ সালের ২২ মার্চের আদেশ আংশিকভাবে বাতিল করে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র এসসি-এসটি আইনের ৩(১)(x) ধারায় অভিযোগ গঠনের নির্দেশ বাতিল করা হয়েছে।

তবে ভারতীয় দণ্ডবিধির অধীনে কোনও অভিযোগ গঠন করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন নতুন করে আইন অনুযায়ী বিবেচনার জন্য ট্রায়াল কোর্টে পাঠানো হয়েছে। হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছে, ওই অভিযোগগুলির গুণগত মান বা সত্যতা সম্পর্কে তারা কোনও মতামত দেয়নি। পাশাপাশি অভিযুক্তদের আগামী ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ট্রায়াল কোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেস টাইটেল: Christine Swaroop Raj & Ors. v. State & Ors. (CRL.M.C. 2555/2012)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button