ইউএপিএ মামলায় সাক্ষী সুরক্ষায় অন্ধ সিদ্ধান্ত নয়, আদালতের কারণ দেখাতে হবে
সাক্ষীর নিরাপত্তা ও অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকার—দুইয়ের ভারসাম্যের নির্দেশ দিল দিল্লি হাইকোর্ট

দিল্লি হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে জানিয়েছে, অবৈধ কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন (ইউএপিএ)-এর অধীনে কোনো সাক্ষীকে “সুরক্ষিত সাক্ষী” (Protected Witness) ঘোষণা করার আগে আদালতকে প্রত্যেক সাক্ষীর ক্ষেত্রে আলাদাভাবে হুমকির মাত্রা যাচাই করতে হবে। সব সাক্ষীকে একসঙ্গে একই ধরনের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সাধারণ বা একযোগে (blanket) নির্দেশ দেওয়া আইনসম্মত নয়।
আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, কোনো সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেওয়া যাবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রে বিচার করতে হবে, সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করলে সত্যিই তাঁর নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে কি না।
বিচারপতি নীনা বানসাল কৃষ্ণ ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই এই রায় দেন। জম্মু ও কাশ্মীরে কথিত সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত একটি এনআইএ মামলায় অভিযুক্ত বিলাল মিরের দায়ের করা দুটি পৃথক আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এই নির্দেশ দেয়।
মামলার সূত্রপাত ২০২১ সালের অক্টোবরে। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) ইউএপিএ এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় একটি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। পরে বিলাল মিরকেও গ্রেফতার করে অভিযুক্ত করা হয়।
চার্জশিট দাখিলের সময় এনআইএ ইউএপিএর ৪৪ ধারা এবং জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা আইনের ১৭ ধারার অধীনে একাধিক প্রসিকিউশন সাক্ষীকে সুরক্ষিত সাক্ষী হিসেবে ঘোষণা করার আবেদন জানায়। বিশেষ এনআইএ আদালত ২০২২ ও ২০২৩ সালে সেই আবেদন মঞ্জুর করে এবং অভিযুক্তদের দেওয়া নথিতে ওই সাক্ষীদের পরিচয় গোপন রাখার নির্দেশ দেয়।
এরপর বিলাল মির ‘এক্স-৫’ এবং ‘এক্স-১১’ নামে চিহ্নিত দুই সুরক্ষিত সাক্ষীর সম্পূর্ণ পরিচয়সহ বয়ানের অনুলিপি চেয়ে আবেদন করেন। তাঁর দাবি ছিল, সাক্ষীদের পরিচয় না জানলে কার্যকরভাবে জেরা করার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব নয়। তবে বিশেষ আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর তিনি দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন।
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে জানায়, ফৌজদারি বিচারে সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা সাধারণ নিয়ম নয়, বরং এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। তাই কোনো সাক্ষীকে সুরক্ষিত ঘোষণা করার আগে বিচারককে স্বাধীনভাবে বিষয়টি মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রত্যেক সাক্ষীর ক্ষেত্রে কেন সুরক্ষা প্রয়োজন, তার কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।
আদালত সুপ্রিম কোর্টের Mohammed Asarudeen v. Union of India মামলার রায়েরও উল্লেখ করে। সেখানে বলা হয়েছে, সুরক্ষিত সাক্ষী ঘোষণার আদেশে স্পষ্ট কারণ থাকতে হবে এবং প্রত্যেক সাক্ষীর ক্ষেত্রে আলাদা করে হুমকির বিষয়টি বিচার করতে হবে।
একই সঙ্গে হাইকোর্ট বলেছে, বিশেষ আইনের অধীনে চলা মামলায় সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত হুমকি থাকলে সাক্ষীরা যেন ভয় ছাড়াই আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করা আদালতের দায়িত্ব।
তবে আদালত এটাও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, অভিযুক্তেরও সংবিধান প্রদত্ত ন্যায্য বিচারের অধিকার রয়েছে। কার্যকর ও অর্থবহ জেরা করার সুযোগ না থাকলে সেই অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই সাক্ষীর পরিচয় গোপন রাখা হবে কি না, তা নির্ধারণের সময় সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
রায়ে আদালত জানায়, যদি কোনো সাক্ষীর পরিচয় প্রকাশ করলে তাঁর জীবনের প্রকৃত ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে বিশেষ আদালত পরিচয় গোপন রাখতে পারবে। তবে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিসংগত কারণ লিখিতভাবে উল্লেখ করতে হবে।
দুই আবেদনের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে সাক্ষীদের সুরক্ষিত ঘোষণা করার আদেশে আদালত হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছে। কারণ, দীর্ঘ সময় পরে সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
তবে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাইয়ের যে আদেশে ‘এক্স-৫’ ও ‘এক্স-১১’-এর পরিচয় প্রকাশের আবেদন খারিজ করা হয়েছিল, সেটি বাতিল করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য বিশেষ এনআইএ আদালতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, সাক্ষ্য গ্রহণের আগে বিচারককে নির্ধারণ করতে হবে, তাঁদের নাম, ঠিকানা ও পরিচয় প্রকাশ করলে সত্যিই নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে কি না। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই কারণ-সম্বলিত নতুন আদেশ দিতে হবে।
আগামী ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে বিশেষ আদালতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি হাইকোর্ট।


