সুপ্রিমকোর্ট

সাক্ষ্য ও ময়নাতদন্তে মিল না থাকায় খালাস বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট

২০ অভিযুক্তকে আবার দোষী করতে অস্বীকৃতি, বোম্বে হাইকোর্টের রায়ে সিলমোহর শীর্ষ আদালতের

মহারাষ্ট্রের ওয়াশিম জেলার বহুল আলোচিত একটি হত্যা মামলায় ২০ জন অভিযুক্তকে খালাস দেওয়ার বোম্বে হাইকোর্টের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছে সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত বলেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার সঙ্গে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং অন্যান্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণের গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি রয়েছে। ফলে হাইকোর্ট যে অভিযুক্তদের খালাস দিয়েছে, তা একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত। শুধুমাত্র ভিন্ন একটি মতামত সম্ভব বলে সেই রায় বাতিল করা যায় না।

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের বেঞ্চ নিহতের মা এবং মহারাষ্ট্র সরকারের করা পৃথক আপিল খারিজ করে এই রায় দেয়।

মামলার ঘটনা ২০১৪ সালের ১৮ মার্চ, হোলির দিন। মহারাষ্ট্রের ওয়াশিম জেলার মানোরা এলাকার নায়ক নগরে এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, অবিনাশ নামে এক যুবক অসুস্থ দিদিমার কথা বিবেচনা করে উচ্চস্বরে বাজানো ডিজের শব্দ কমানোর অনুরোধ করতে যান। এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। সেই সময় ২০১৩ সালের জেলা পরিষদ নির্বাচনের পুরোনো বিরোধের প্রসঙ্গও উঠে আসে এবং তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

কয়েক ঘণ্টা পরে অবিনাশ তাঁর বাবা, ভাই ও এক চাচাতো ভাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। অভিযোগ, তখন একদল ব্যক্তি তাঁদের গাড়ি থেকে টেনে বের করে লোহার পাইপ, রড ও কাঠের তক্তা দিয়ে মারধর করে। ঘটনাস্থলেই অবিনাশের মৃত্যু হয়। অন্য তিনজন আহত হন।

পুলিশ ২৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে। ২০১৮ সালে ট্রায়াল কোর্ট ২০ জনকে হত্যা-সহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে এবং তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তবে ২০২২ সালে বোম্বে হাইকোর্ট সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পুনর্বিবেচনা করে ওই রায় বাতিল করে সব অভিযুক্তকে খালাস দেয়। হাইকোর্টের মতে, অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রসিকিউশন।

এরপর নিহতের মা এবং মহারাষ্ট্র সরকার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে।

শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট ছয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে। আদালত লক্ষ্য করে, প্রত্যেক সাক্ষী প্রায় হুবহু একই ভাষায় বর্ণনা করেছেন—কোন অভিযুক্ত কাকে ধরে রেখেছিল, কার হাতে কোন অস্ত্র ছিল এবং কে কীভাবে হামলা চালিয়েছিল।

আদালত মন্তব্য করে, হঠাৎ ঘটে যাওয়া একটি সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে কিছু স্বাভাবিক পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। বরং সেই পার্থক্য সাক্ষ্যকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। কিন্তু এখানে ২৩ জন অভিযুক্তের ভূমিকা সম্পর্কে সব সাক্ষীর বক্তব্য প্রায় শব্দে-শব্দে এক হওয়ায় সেই সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টও প্রসিকিউশনের বক্তব্যকে সমর্থন করেনি। অভিযোগ ছিল, চারজন অভিযুক্ত টানা দুই থেকে তিন মিনিট লোহার পাইপ দিয়ে অবিনাশের মাথায় আঘাত করেন। কিন্তু ময়নাতদন্তে মাত্র একটি কাটা ক্ষত এবং একটি হাড় ভাঙার চিহ্ন পাওয়া যায়। যিনি ময়নাতদন্ত করেছিলেন, সেই চিকিৎসকও জেরা চলাকালে স্বীকার করেন, যদি চারজন ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ধরে লোহার পাইপ দিয়ে মাথায় আঘাত করতেন, তাহলে আঘাতের মাত্রা আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল।

এছাড়া আহত এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি ছিল, তাঁর চোখের বল বেরিয়ে এসেছিল এবং দাঁত ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের নথিতে এমন কোনো আঘাতের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

সুপ্রিম কোর্ট আরও উল্লেখ করে, ঘটনাস্থলে ৪০ থেকে ৫০ জন মানুষ উপস্থিত থাকলেও কোনো স্বাধীন প্রত্যক্ষদর্শীকে সাক্ষী করা হয়নি। দুই প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ঘটনার দুই দিন পরে রেকর্ড করা হলেও তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, কয়েকজন অভিযুক্তের শরীরে যে আঘাতের চিহ্ন ছিল, তারও কোনো ব্যাখ্যা প্রসিকিউশন দিতে পারেনি।

আদালত Sanjay Kumar v. State of Bihar মামলার পূর্ববর্তী রায়ের উল্লেখ করে জানায়, যখন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য চিকিৎসা-প্রমাণের সঙ্গে মেলে না এবং স্বাধীন সাক্ষ্যও অনুপস্থিত থাকে, তখন খালাসের রায় বাতিল করার ক্ষেত্রে আদালতকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।

সব দিক বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, বোম্বে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই অযৌক্তিক বা বিকৃত (perverse) নয়। সংবিধানের ১৩৬ অনুচ্ছেদের অধীনে শুধুমাত্র অন্য একটি মতামত সম্ভব বলেই খালাসের রায়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।

ফলে নিহতের মা এবং মহারাষ্ট্র সরকারের দায়ের করা সব আপিল খারিজ করে ২০২২ সালে বোম্বে হাইকোর্টের দেওয়া ২০ অভিযুক্তের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়েছে।

কেস টাইটেল: Nirmala Bai Devidas Chavhan v. State of Maharashtra & Others (Criminal Appeal Nos. 502–507 of 2023 with Criminal Appeal Nos. 508–513 of 2023)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button