ছানি অস্ত্রোপচারে দৃষ্টিশক্তি হারানো, রাজ্যকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ
সরকারি হাসপাতালে পরিকাঠামো ও জীবাণুমুক্তকরণে গাফিলতির অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত রোগীর পাশে কলকাতা হাইকোর্ট

সরকারি হাসপাতালে ছানি অস্ত্রোপচার করিয়ে দৃষ্টিশক্তির বড় ক্ষতি হয়েছিল। সেই রোগীকেই এবার ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য, সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগে ঘাটতি থাকলে সেই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না রাজ্য।
ঘটনাটি গার্ডেনরিচ স্টেট জেনারেল হাসপাতাল তথা মেটিয়াব্রুজ সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের। সেখানে ছানি অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর শারীরিক জটিলতা তৈরি হয় আবেদনকারী গোবিন্দ চন্দ্র দেবনাথের। পরে তাঁকে আরও চিকিৎসার জন্য কলকাতার রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব অপথ্যালমোলজি বা RIO-তে নিয়ে যেতে হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, গোবিন্দ চন্দ্র পেশায় ইলেকট্রিশিয়ান এবং স্বনিযুক্ত কর্মী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীও তিনি। অস্ত্রোপচারের পর তাঁর দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তিনি আংশিকভাবে অন্ধ হয়ে পড়েন। শুধু তিনি নন, একই হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানো আরও কয়েকজন রোগীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
RIO-এর পরিচালকের একটি রিপোর্টে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম অথবা ব্যবহৃত তরলে জীবাণুর সংক্রমণ এবং যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই ঘটনার পর হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের পরিকাঠামো নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। একটি মেডিক্যাল বোর্ড অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, প্রশিক্ষিত নার্স ও অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ, নিয়মিত জীবাণুমুক্তকরণ এবং অটোক্লেভ ব্যবস্থার মতো একাধিক নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের সুপারিশ করেছিল।
কিন্তু একই মেডিক্যাল বোর্ড আবার সরাসরি ‘মেডিক্যাল নেগলিজেন্স’ বা চিকিৎসাগত গাফিলতি হয়নি বলেও মত দিয়েছিল।
এই অবস্থানই মেনে নেয়নি কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, হাসপাতালের পরিকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির সঙ্গে রোগীর দৃষ্টিশক্তি হারানোর যোগসূত্র থাকলে রাজ্য দায় এড়াতে পারে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, “The liability of the State cannot be avoided.”
আদালত আরও উল্লেখ করে, মোট ৪৪ জন রোগী ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে ২২ জনের দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালের পরিকাঠামো ও কর্মীসংক্রান্ত ঘাটতি চিহ্নিত হওয়ার পরও কেন অস্ত্রোপচার চালিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নও তোলে বেঞ্চ।
এই মামলায় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আদালত জানায়, চোখের দৃষ্টিশক্তি মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে যুক্ত। তাই সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাজ্যের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
হাইকোর্ট D.K. Basu, Nilabati Behera, Achutrao Haribhau Khodwa এবং Paschim Banga Khet Mazdoor Samity মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া নীতির উপরও নির্ভর করে। আদালতের মতে, উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক আদালত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য ‘public-law remedy’ হিসেবে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে পারে।
এর আগে আবেদনকারীকে ক্ষতিপূরণের জন্য অন্য কোনও ফোরামে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশও বাতিল করে দিয়েছে হাইকোর্ট।
আদালত রাজ্য সরকারকে আট সপ্তাহের মধ্যে গোবিন্দ চন্দ্র দেবনাথকে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে, আদালতের আদেশের তারিখ থেকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ওই টাকার উপর বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে সরল সুদ দিতে হবে।
ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণের সময় আদালত চিকিৎসার খরচ, ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে ক্ষতির সম্ভাবনা এবং আবেদনকারী পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী—এই বিষয়গুলিও বিবেচনা করেছে।
অর্থাৎ, এই রায় শুধু একজন রোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ নয়। সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাজ্যের দায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ—সেই বিষয়েও কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল।
কেস টাইটেল: Gobinda Chandra Debnath v. The State of West Bengal & Ors.
কেস নম্বর: F.M.A. 1457 of 2025
বিচারপতি: Justice Shampa Sarkar ও Justice Arjun Ray Mukherjee
রায়ের তারিখ: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬



