গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলা চললেই অন্য ফৌজদারি বিচার থামবে না, গুরুত্বপূর্ণ রায় সুপ্রিম কোর্টের
তারিখের সংঘাত হলে শুধু গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, অন্য বিচারপ্রক্রিয়া স্থগিত নয়

উত্তরপ্রদেশ গ্যাংস্টার্স অ্যান্ড অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট, ১৯৮৬-এর ধারা ১২ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছে, একই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অন্য কোনও ফৌজদারি মামলা চললে শুধু গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলা বিচারাধীন থাকার কারণে সেই বিচারপ্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে হবে—এমন কোনও বাধ্যবাধকতা ধারা ১২-তে নেই।
বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথন এবং বিচারপতি অরুণ পাল্লির বেঞ্চ জানিয়েছে, দুটি মামলার শুনানির তারিখে সংঘাত তৈরি হলে গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অন্য ফৌজদারি মামলার বিচারপ্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে ‘ফ্রিজ’ বা স্থগিত করে রাখতে হবে।
মামলার সূত্রপাত
মামলাটির সূত্রপাত উত্তরপ্রদেশের ললিতপুরে রাঘবেন্দ্র সিংয়ের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি এফআইআর থেকে। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারাসহ একাধিক ধারায় নয়জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
তদন্তের পর সাতজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করা হয় এবং মামলাটি সেশনস কোর্টে পাঠানো হয়। মামলাটি Session Trial No. 934 of 2023 হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
পরবর্তীতে উত্তরপ্রদেশ গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের অধীনেও মামলা শুরু হয়। ১ জানুয়ারি ২০২৪ একটি পৃথক গ্যাংস্টার্স অ্যাক্ট এফআইআর দায়ের করা হয় এবং সেই মামলা Session Trial No. 1 of 2024 হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অভিযুক্তরা মূল সেশনস ট্রায়ালটি স্থগিত রাখার আবেদন করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, ধারা ১২ অনুযায়ী গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সেশনস কোর্ট ৩ মার্চ ২০২৫ সেই আবেদন খারিজ করে। আদালত উল্লেখ করে, ৮ জানুয়ারি ২০২৫-এর মধ্যেই মূল মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ শেষ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে, গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলার বিচার তখনও শুরু হয়নি।
পরবর্তীতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট ভিন্ন অবস্থান নেয় এবং মূল সেশনস ট্রায়াল স্থগিত রেখে গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাটি দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়।
ধারা ১২ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের ব্যাখ্যা
সুপ্রিম কোর্ট তার আগের রায় Dharmendra Kirthal v. State of U.P.-এর উপর নির্ভর করে ধারা ১২-এর ব্যাখ্যা করে। ওই মামলায় ধারা ১২-কে এমন একটি ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য হল দুটি মামলার শুনানির তারিখে সংঘাত এড়ানো এবং গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের বিচার যাতে অযথা বিলম্বিত না হয় তা নিশ্চিত করা।
বর্তমান মামলায় আদালত জানায়, আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য “not to freeze the other proceedings”। অর্থাৎ, অন্যান্য ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়াকে স্থগিত করে রাখা এই ধারার উদ্দেশ্য নয়।
বরং, দুটি মামলার শুনানির তারিখে সংঘাত দেখা দিলে গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিদিন বিচার এবং অযথা মুলতবি নয়
বেঞ্চ Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita, 2023-এর ধারা ৩৪৬-এর বিষয়টিও বিবেচনা করে। ওই বিধান অনুযায়ী, সাধারণভাবে ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া প্রতিদিন চালিয়ে যাওয়ার কথা এবং অপ্রয়োজনীয় মুলতবির উপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
দুই বিধান একসঙ্গে বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ধারা ১২-এর অর্থ হল—তারিখের সংঘাত হলে গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু অন্য মামলার বিচার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা নয়।
দ্রুত বিচারের অধিকার শুধু অভিযুক্তের নয়
সুপ্রিম কোর্ট একইসঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এর অধীনে দ্রুত বিচারের অধিকারের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করে। আদালত জানায়, দ্রুত বিচারের অধিকার শুধু অভিযুক্তের জন্য প্রযোজ্য নয়; এই অধিকার ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রেও সুরক্ষিত।
দীর্ঘদিন বিচারপ্রক্রিয়া চলতে থাকলে প্রমাণ সংরক্ষণ, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং তাঁদের স্মৃতিশক্তির উপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে শুধুমাত্র একটি গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলা বিচারাধীন থাকার কারণে অন্য সব ফৌজদারি মামলা স্থগিত রাখার ব্যাখ্যা গুরুতর অবিচারের কারণ হতে পারে।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ খারিজ
সুপ্রিম কোর্ট দেখতে পায়, মূল সেশনস ট্রায়াল স্থগিত রাখার আবেদন যখন করা হয়েছিল, তখন দুটি মামলার শুনানির তারিখে কোনও সংঘাত ছিল না। গ্যাংস্টার্স অ্যাক্টের মামলাটি তখনও শুধু চার্জশিট দাখিলের পর্যায়ে ছিল। অন্যদিকে, মূল সেশনস ট্রায়ালে সাক্ষ্যপ্রমাণ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে এলাহাবাদ হাইকোর্ট Session Trial No. 934 of 2023 স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়ে ভুল করেছিল বলে সুপ্রিম কোর্ট জানায়। আদালত হাইকোর্টের ওই নির্দেশকে “completely untenable” বা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করে।
সুপ্রিম কোর্ট ২৫ আগস্ট ২০২৫-এর এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ বাতিল করে আপিল মঞ্জুর করেছে। আদালত আরও নথিভুক্ত করেছে যে, সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশের পর মূল সেশনস ট্রায়াল ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ
মামলার নাম: Keshvendra Singh v. Shankar Singh & Anr.
মামলা নম্বর: Criminal Appeal No. of 2026 (@ Special Leave Petition (Crl.) No. 2815/2026)
বিচারপতি: বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথন এবং বিচারপতি অরুণ পাল্লি
রায়ের তারিখ: ১৭ আগস্ট ২০২৬



