হাইকোর্ট

সন্তানের মাসিক ভরণপোষণের বিকল্প হতে পারে না স্থায়ী আমানত, জানাল কলকাতা হাইকোর্ট

ভবিষ্যতের সঞ্চয় এক বিষয়, দৈনন্দিন খরচ মেটাতে মাসিক ভরণপোষণই প্রয়োজন বলল আদালত

সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য করা স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) কখনও সন্তানের মাসিক ভরণপোষণের বিকল্প হতে পারে না। গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে এমনটাই জানিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, একটি ফিক্সড ডিপোজিট সন্তানের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু তার পড়াশোনা, খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য দৈনন্দিন খরচ মেটানোর জন্য নিয়মিত মাসিক ভরণপোষণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না।

বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় (দাস) স্ত্রীর দায়ের করা একটি পুনর্বিবেচনার আবেদন আংশিকভাবে মঞ্জুর করে এই রায় দেন। আদালত সন্তানের নামে ১১ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট তৈরির ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বাতিল করে নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের বিষয়টি নতুন করে শুনানির জন্য নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠিয়েছে। তবে স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেওয়ার সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেনি হাইকোর্ট।

মামলার সূত্রপাত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারার অধীনে দায়ের করা একটি ভরণপোষণের আবেদন থেকে। আবেদনকারী স্ত্রী নিজের জন্য মাসে ৩০ হাজার টাকা এবং নাবালক সন্তানের জন্য মাসে ২০ হাজার টাকা ভরণপোষণ দাবি করেছিলেন।

শুনানির প্রাথমিক পর্যায়ে বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট সন্তানের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন ভরণপোষণ হিসেবে মাসে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ২০২২ সালের অক্টোবরে চূড়ান্ত রায়ে ম্যাজিস্ট্রেট স্ত্রী ও সন্তানের কারও জন্যই মাসিক ভরণপোষণ মঞ্জুর করেননি। পরিবর্তে তিনি স্বামীকে সন্তানের নামে ১১ লক্ষ টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট তৈরি করে তা মায়ের মনোনয়নে (নমিনি) রাখার নির্দেশ দেন।

এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে স্ত্রী কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেন। তাঁর দাবি ছিল, একটি স্থায়ী আমানত সন্তানের নিয়মিত শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে পারে না। তাই মাসিক ভরণপোষণের পরিবর্তে ফিক্সড ডিপোজিটের নির্দেশ আইনসঙ্গত নয়।

মামলার শুনানিতে হাইকোর্ট উভয় পক্ষের আর্থিক অবস্থাও পর্যালোচনা করে। আদালত দেখতে পায়, স্ত্রী উচ্চশিক্ষিত এবং তাঁর একাধিক পেশাগত ডিগ্রি রয়েছে। তিনি পূর্বে নিজের মাসিক আয় ৫৫ হাজার টাকারও বেশি বলে উল্লেখ করেছিলেন। অন্যদিকে, স্বামীর মাসিক বেতন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি পারিবারিক ব্যবসার মালিক—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও আদালতের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।

আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবা ও মা—উভয়েরই সমান। তবে আদালত এটাও লক্ষ্য করে যে, মূল শুনানির সময় সন্তানের প্রকৃত মাসিক খরচের বিস্তারিত হিসাব বা প্রয়োজনীয় নথি মা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দাখিল করেননি।

ফিক্সড ডিপোজিটের প্রসঙ্গে বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় (দাস) বলেন, একজন বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য ফিক্সড ডিপোজিট করতে পারেন, এতে কোনো আইনি বাধা নেই। কিন্তু সেই ফিক্সড ডিপোজিট কখনও মাসিক ভরণপোষণের বিকল্প হতে পারে না।

আদালত আরও উল্লেখ করে, ফিক্সড ডিপোজিট থেকে সুদ পাওয়া গেলেও তা সন্তানের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ করতে পারে না। মাসিক ভরণপোষণের উদ্দেশ্যই হলো নিয়মিত ও পুনরাবৃত্ত ব্যয় নির্বাহ করা।

সব দিক বিবেচনা করে হাইকোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সেই নির্দেশ বাতিল করেছে, যেখানে ১১ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিটকে সন্তানের ভরণপোষণের বিকল্প হিসেবে ধরা হয়েছিল। বিষয়টি নতুন করে শুনানির জন্য ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে। উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় নথি ও হলফনামা দাখিলের সুযোগ দিয়ে নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের পরিমাণ নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।

তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সন্তানের নিয়মিত খরচ চালানোর জন্য মা-কে ওই ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের অর্থ তোলার অনুমতি দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নতুন হলফনামা দাখিলের পর সম্ভব হলে তিন মাসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করার নির্দেশও দিয়েছে আদালত।

কেস টাইটেল: Poulami Tarafdar (Saha) v. Dibesh Saha (CRR 146 of 2023)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button