গৌতম আদানি মামলায় বড় মোড়, ‘বিচারের বাস্তব সম্ভাবনাই ছিল না’—মার্কিন আদালতে জানাল বিচার বিভাগ

ভারতের শিল্পপতি গৌতম আদানি ও অন্যদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা নিয়ে বড় অবস্থান পরিবর্তন করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (Department of Justice বা DOJ)। নিউইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে জমা দেওয়া এক বিস্তারিত আবেদনে DOJ জানিয়েছে, এই মামলাটি শুরু থেকেই এমন একটি ‘নাম প্রকাশ করে অভিযুক্ত করার’ (name and shame) মামলা ছিল, যার বিচার পর্যন্ত গড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা ছিল না।
৪ জুলাই বিচারপতি নিকোলাস জি. গারাউফিসের আদালতে দাখিল করা নথিতে DOJ অনুরোধ করেছে, United States v. Gautam S. Adani and Others মামলার সমস্ত অভিযোগ স্থায়ীভাবে (dismissal with prejudice) খারিজ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে একই অভিযোগে মামলা পুনরায় চালু করা না যায়।
এর আগে আদালত DOJ-কে মামলা প্রত্যাহারের কারণ আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করতে বলেছিল। কারণ, বিচারকের মতে, আগের আবেদনটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং পর্যাপ্ত ব্যাখ্যাহীন।
DOJ তাদের আবেদনে দাবি করেছে, আগের মার্কিন প্রশাসনের শেষ পর্যায়ে এই অভিযোগপত্র প্রকাশ করা হয়েছিল মূলত অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ্যে এনে বদনাম করার উদ্দেশ্যে। বিভাগটির ভাষায়, সে সময়কার প্রশাসন জানত যে মামলাটি বাস্তবে বিচারের পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম, তবুও তারা এটি দায়ের করেছিল।
প্রিন্সিপাল অ্যাসোসিয়েট ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আর. ট্রেন্ট ম্যাককটার স্বাক্ষরিত নথিতে বলা হয়েছে, মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক, শত শত নথি পর্যালোচনা, অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং স্বাধীন আইনি মূল্যায়ন করা হয়েছে। DOJ-এর দাবি, মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না।
বিচার বিভাগের অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো, অভিযোগের প্রায় পুরো ঘটনাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত। অভিযোগ অনুযায়ী, ভারতীয় নাগরিকরা ভারতের সরকারি বিদ্যুৎ প্রকল্প সংক্রান্ত চুক্তি পেতে ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তাই এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের করাই বেশি উপযুক্ত বলে DOJ মনে করে।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্বের প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিজেকে “বিশ্ব পুলিশ” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে তা কূটনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে সম্পদ ও মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
DOJ আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলোর বিভিন্ন দিক পরীক্ষা করে এমন কোনো কার্যকর অপরাধের প্রমাণ পায়নি, যার ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলা চালানো প্রয়োজন।
বিচার বিভাগ সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কোনো বিনিয়োগকারীর আর্থিক ক্ষতি হয়নি। দুটি ঋণপত্র ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়েছে এবং বাকি ঋণপত্রেও কোনো খেলাপি হয়নি। তাই এই অভিযোগ আনারই প্রয়োজন ছিল না বলে DOJ মনে করছে।
এছাড়া DOJ বলেছে, বিদেশি দুর্নীতি দমন আইন (FCPA)-এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি এমন অভিযোগকে সিকিউরিটিজ জালিয়াতি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ অভিযোগের অধিকাংশ ঘটনাই ভারতে ঘটেছে, ফলে মার্কিন আইনের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
DOJ আরও উল্লেখ করেছে, মামলার বেশিরভাগ নথি ও সাক্ষী ভারতে অবস্থান করছেন। অভিযুক্তরাও মার্কিন নাগরিক নন এবং তাঁরা কখনও মার্কিন আদালতে হাজির হননি। তাঁদের গ্রেপ্তার বা যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বাস্তব সম্ভাবনাও খুব কম।
মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সম্পর্কিত—এমন সংবাদমাধ্যমের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেও জানিয়েছে DOJ। বিভাগটির বক্তব্য, সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়ে কোনো আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য, এই মামলায় গৌতম আদানি, সাগর আদানি, বনীত জৈন, রঞ্জিত গুপ্তসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রায় ২,০২৯ কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল, যাতে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রায় ১,৭৫০ কোটি টাকা অন্ধ্রপ্রদেশের কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল বলে অভিযোগ। তবে অভিযুক্তরা শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।



