হাইকোর্ট

পণমৃত্যু মামলায় যাবজ্জীবন বাধ্যতামূলক নয়, গুরুত্বপূর্ণ রায় এল হাইকোর্টের

দোষী সাব্যস্ত বহাল রেখেও যাবজ্জীবনের সাজা কমাল এলাহাবাদ হাইকোর্ট

এলাহাবাদ হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে, ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩০৪বি ধারায় পণের কারণে মৃত্যুর মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলেই অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। মামলার পরিস্থিতি, অপরাধের প্রকৃতি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিচার করে আদালত সাত বছরের ন্যূনতম সাজা থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন পর্যন্ত যে কোনও শাস্তি দিতে পারে। বিরল এবং ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সাজা অর্থাৎ যাবজ্জীবন দেওয়া উচিত।

বিচারপতি রাজেশ সিং চৌহান এবং বিচারপতি অবধেশ কুমার চৌধুরীর ডিভিশন বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করে এক পণমৃত্যু মামলায় ট্রায়াল কোর্টের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কমিয়ে অভিযুক্তদের ইতিমধ্যে কারাভোগ করা সময়কেই শাস্তি হিসেবে গণ্য করেছে। তবে আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৪বি ও ৪৯৮এ ধারা এবং পণনিষেধ আইন, ১৯৬১-এর ৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রেখেছে।

মামলার ঘটনায় জানা যায়, প্রায় ২৫ বছর বয়সি এক গৃহবধূ এবং তাঁর ১৫ মাসের কন্যাশিশুর মৃতদেহ শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার হয়। অভিযোগ ছিল, বিয়ের পর থেকেই ওই মহিলার ওপর একটি মোটরসাইকেল এবং এক লক্ষ টাকা পণের দাবিতে ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হচ্ছিল। পরে তাঁকে এবং তাঁর শিশুকন্যাকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

ট্রায়াল কোর্ট স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পণমৃত্যু, নিষ্ঠুর আচরণ এবং পণ দাবির অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় দেয়। যদিও হত্যার অভিযোগে তাঁদের খালাস দেওয়া হয়। পণমৃত্যুর অপরাধে অভিযুক্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৪৯৮এ ধারায় দুই বছরের কারাদণ্ড এবং পণনিষেধ আইনে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়।

এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে অভিযুক্তরা দাবি করেন, তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত ভুল। বিকল্পভাবে তাঁরা বলেন, যদি দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহালও থাকে, তবুও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার কোনও যুক্তি ছিল না। তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের একাধিক পূর্ববর্তী রায়ের উল্লেখ করে জানান, ৩০৪বি ধারায় যাবজ্জীবন বাধ্যতামূলক নয়।

হাইকোর্ট প্রথমে পরীক্ষা করে দেখে, ৩০৪বি ধারার প্রয়োজনীয় সমস্ত শর্ত এই মামলায় পূরণ হয়েছে কি না। আদালত দেখতে পায়, বিয়ের সাত বছরের মধ্যেই ওই মহিলার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তাঁর ওপর পণের দাবিতে নির্যাতন চলছিল। সাক্ষীদের বয়ান অনুযায়ী, মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন আগে পণের দাবি করা হয়েছিল। তাই আদালত মনে করে, আইন অনুযায়ী “মৃত্যুর কিছুদিন আগে” পণের দাবির শর্ত এই মামলায় পূরণ হয়েছে।

মেডিক্যাল রিপোর্ট ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত জানায়, মা ও শিশুর শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাঁদের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। ফলে ৩০৪বি ধারার অপরিহার্য উপাদান প্রমাণিত হয়েছে।

এরপর আদালত ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের ১১৩বি ধারার আইনি অনুমান (presumption)-এর প্রয়োগ করে। আদালত জানায়, একবার পণমৃত্যুর প্রাথমিক উপাদানগুলি প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের ওপর নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু এই মামলায় অভিযুক্তরা কোনও প্রতিরক্ষা সাক্ষী হাজির করতে পারেননি। স্বামীর দাবি ছিল, অজ্ঞাতপরিচয় কেউ স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করেছে। আদালত সেই ব্যাখ্যাকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেনি।

আদালত আরও উল্লেখ করে, একই বাড়ি থেকে স্ত্রী ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার হলেও স্বামী তাঁদের মৃত্যুর কোনও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এছাড়া তদন্তের সময় এক সাক্ষী শত্রুভাবাপন্ন (hostile) হয়ে গেলেও তাঁর সাক্ষ্য সম্পূর্ণ বাতিল করা যায় না বলেও আদালত স্পষ্ট করেছে।

সব দিক বিবেচনা করে হাইকোর্ট দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রাখে। তবে সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ট্রায়াল কোর্টের সমালোচনা করে আদালত জানায়, কেন প্রত্যেক অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হল, সেই বিষয়ে কোনও যুক্তি ট্রায়াল কোর্ট উল্লেখ করেনি। শুধু দোষী সাব্যস্ত হলেই যাবজ্জীবন দেওয়া যায় না।

সাজা কমানোর ক্ষেত্রে আদালত কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আগে কোনও অপরাধের ইতিহাস ছিল না। তাঁরা ইতিমধ্যে সাত বছরেরও বেশি সময় কারাভোগ করেছেন, যা ৩০৪বি ধারায় নির্ধারিত ন্যূনতম শাস্তির চেয়েও বেশি। জেলে তাঁদের আচরণ নিয়েও কোনও নেতিবাচক রিপোর্ট ছিল না। পাশাপাশি তাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বল কৃষক পরিবারের সদস্য এবং ভবিষ্যতে সমাজে পুনর্বাসনের সম্ভাবনাও আদালত বিবেচনা করে।

রায়ের শেষ অংশে আদালত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তাও দেয়। আদালত জানায়, বিবাহিত কোনও নারী যদি বারবার পণের নির্যাতনের অভিযোগ করেন, তবে তা সাধারণ পারিবারিক অশান্তি হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলিকে সাহায্যের আর্তি হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আদালতের মতে, ৪৯৮এ এবং ৩০৪বি ধারার উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং বিবাহিত নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ প্রতিরোধ করা।

ফলে হাইকোর্ট দোষী সাব্যস্ত করার রায় বহাল রেখে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কমিয়ে ইতিমধ্যে কারাভোগ করা সময়কে শাস্তি হিসেবে গণ্য করে এবং অন্য কোনও মামলায় প্রয়োজন না থাকলে হেফাজতে থাকা অভিযুক্তদের মুক্তির নির্দেশ দেয়।

কেস টাইটেল: Dinesh Kumar and Others v. State of Uttar Pradesh (Neutral Citation: 2026:AHC-LKO:50697-DB)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button