সুপ্রিমকোর্ট

১২ বছর বিচারাধীন বন্দিত্বের পর ইউএপিএ মামলায় জামিন দিল সুপ্রিম কোর্ট

ধীরগতির বিচার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের ভিত্তিতে মিলল গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি

ভারতে সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত একটি বহুল আলোচিত মামলায় দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর বিচারাধীন অবস্থায় কারাবন্দি থাকার পর দুই অভিযুক্তকে জামিন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বিচারের অস্বাভাবিক ধীরগতি এবং দ্রুত বিচার শেষ হওয়ার কোনও বাস্তব সম্ভাবনা না থাকায় অভিযুক্তদের অনির্দিষ্টকাল জেলে আটকে রাখা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের পরিপন্থী।

বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে এই নির্দেশ দেয়। মামলায় আবেদনকারী ছিলেন মহম্মদ সাকিব আনসারি এবং ওয়াকার আজহার। তাঁরা দিল্লির স্পেশাল সেল থানায় ২০১১ সালে দায়ের হওয়া একটি মামলায় গ্রেফতার হয়ে ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে কারাগারে ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধি, বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন (ইউএপিএ), বিস্ফোরক পদার্থ আইন, অস্ত্র আইন এবং পাসপোর্ট আইনের একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে এক পাকিস্তানি নাগরিককে গ্রেফতারের পর তদন্তে অভিযোগ ওঠে যে, দিল্লি ও তার আশপাশে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ পরিচালনার উদ্দেশ্যে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের একটি রাজস্থান মডিউল গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে জোধপুরে মহম্মদ সাকিব আনসারির বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে গানপাউডার, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, ডেটোনেটরসহ বিস্ফোরক তৈরির বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করার দাবি করে তদন্তকারী সংস্থা। একইভাবে জয়পুরে ওয়াকার আজহারের কাছ থেকেও বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাগুলির ভিত্তিতে রাজস্থানে পৃথক দুটি এফআইআরও দায়ের করা হয়।

সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্য করে যে, রাজস্থানের একটি মামলায় দুই অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হলেও রাজস্থান হাই কোর্ট তাঁদের সাজা স্থগিত করেছে। অন্য একটি মামলায়ও তাঁরা ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন। ফলে বর্তমানে তাঁদের কারাবাস শুধুমাত্র দিল্লির ২০১১ সালের এফআইআর-সংক্রান্ত মামলার কারণেই অব্যাহত ছিল।

বেঞ্চ আরও উল্লেখ করে, মামলার বিচার অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। আদালত ই-কোর্টস পোর্টালের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, মোট ১৯৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ৬৮ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ চলছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুনানির সময় পর্যন্ত মাত্র দু’জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে একজনের সাক্ষ্যও সম্পূর্ণ হয়নি। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে বিচার শেষ হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আদালতের নজরে আসেনি।

সুপ্রিম কোর্ট আরও বিবেচনা করে যে, একই মামলার এক সহ-অভিযুক্ত মহম্মদ মারুফ ইতিমধ্যেই জামিন পেয়েছেন। এছাড়া আবেদনকারীরা রাজস্থানের সংশ্লিষ্ট মামলাগুলিতে সাজা স্থগিত এবং জামিন—দুই ধরনেরই স্বস্তি পেয়েছেন। এই সমস্ত বিষয় একসঙ্গে বিচার করে আদালত মত দেয় যে, শুধুমাত্র বিচার শেষ না হওয়ার কারণে তাঁদের আরও দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হবে।

এরপর সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, অন্য কোনও মামলায় প্রয়োজন না থাকলে দুই আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট ট্রায়াল কোর্ট নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, এই পর্যবেক্ষণ শুধুমাত্র জামিনের আবেদন নিষ্পত্তির জন্য করা হয়েছে; বিচারাধীন মামলার মূল অভিযোগের সত্যতা বা দোষ-নির্দোষ সম্পর্কে কোনও মতামত হিসেবে এটি গণ্য করা যাবে না। আদালত আরও নির্দেশ দেয়, অভিযুক্তদের বিচারপ্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। ভবিষ্যতে যদি তাঁরা বিচার বিলম্বিত করেন বা জামিনের অপব্যবহার করেন, তাহলে প্রসিকিউশন পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবে।

Mohd. Saquib Ansari vs State (NCT of Delhi) & Connected Matter (SLP (Crl.) No. 11369/2026 with SLP (Crl.) No. 11414/2026)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button