হাইকোর্ট

নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা থাকলে সংশোধনের ক্ষমতাও থাকে, জানাল সুপ্রিম কোর্ট

রেজিস্ট্রারের ক্ষমতা বৈধ, পদোন্নতি বাতিলের হাইকোর্টের রায় খারিজ সুপ্রিম কোর্টের

একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, কোনও কর্তৃপক্ষকে যদি আইন দ্বারা নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে সেই ক্ষমতার মধ্যেই নিয়ম সংশোধন, পরিবর্তন বা বাতিল করার ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই নীতির ভিত্তিতেই আদালত রায় দিয়েছে যে, ছত্তীসগড় সমবায় সমিতি আইন, ১৯৬০-এর ৫৫ ধারার অধীনে সমবায় সমিতির কর্মীদের চাকরির শর্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়ম সংশোধনের ক্ষমতা রেজিস্ট্রারের রয়েছে।

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায়ে ছত্তীসগড় হাইকোর্টের একক এবং ডিভিশন বেঞ্চের রায় বাতিল করে আবেদনকারী এস. পি. চন্দ্রাকরের পদোন্নতি পুনর্বহাল করার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে আদালত তাঁর জ্যেষ্ঠতা (সিনিয়রিটি) বহাল রাখার এবং ৫০ শতাংশ বকেয়া বেতন দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে।

মামলার আবেদনকারী এস. পি. চন্দ্রাকর এবং প্রতিপক্ষ কিশোর বাঘ—দুজনেই রায়পুর জেলা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের কর্মী। তাঁদের চাকরির শর্ত ছত্তীসগড় সমবায় সমিতি আইন, ১৯৬০-এর ৫৫ ধারার অধীনে প্রণীত ছত্তীসগড় জেলা সমবায় কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক কর্মচারী পরিষেবা বিধি, ১৯৮২ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

বিতর্কের সূত্রপাত ২০০৫ সালে। ওই সময় সমবায় সমিতির রেজিস্ট্রার পরিষেবা বিধির ৫(৩)(ক), (খ) এবং (গ) উপধারায় সংশোধন আনেন। এর পর ২০০৫-০৬ সালে ব্যাঙ্কের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের একটি জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি হয়। সেখানে প্রথমে এস. পি. চন্দ্রাকরের নাম বাদ পড়লেও পরে সংশোধনের আবেদন করার পর তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানান কিশোর বাঘ। তাঁর দাবি ছিল, চন্দ্রাকর মূলত সহকারী প্রকৌশলী (Assistant Engineer) হিসেবে একটি কারিগরি পদে নিযুক্ত ছিলেন। অথচ অতিরিক্ত ম্যানেজার (Additional Manager) একটি অ-কারিগরি প্রশাসনিক পদ। পরিষেবা বিধির ৫(৩)(ক) অনুযায়ী তিনি ওই পদে পদোন্নতির যোগ্য নন।

অন্যদিকে কারিগরি শাখার কর্মীরা, যার মধ্যে চন্দ্রাকরও ছিলেন, ওই বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার জন্য আবেদন করেন। এরপর অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার একটি সার্কুলার জারি করে সংশ্লিষ্ট বিধানটি বাতিল হয়েছে বলে জানান। পরে রেজিস্ট্রার সমবায় সমিতি জেলা কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাঙ্কের মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিককে সংশোধিত বিধি অনুযায়ী পদোন্নতির প্রক্রিয়া চালানোর নির্দেশ দেন। বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে চন্দ্রাকরকে অতিরিক্ত ম্যানেজার পদে উন্নীত করা হয়।

এই পদোন্নতির বিরুদ্ধে কিশোর বাঘ হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। একক বেঞ্চ প্রায় ১৩ বছর পরে চন্দ্রাকরের পদোন্নতি বাতিল করে। পরে ডিভিশন বেঞ্চও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এরপর চন্দ্রাকর সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।

সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ছত্তীসগড় সমবায় সমিতি আইনের ৫৫(১) ধারা রেজিস্ট্রারকে পরিষেবা সংক্রান্ত নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। তাই একই সঙ্গে সেই নিয়ম সংশোধন বা বাতিল করার ক্ষমতাও তাঁর রয়েছে। আদালত এ ক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ২১ ধারা-র উল্লেখ করে বলে, কোনও আইনে যদি বিজ্ঞপ্তি, আদেশ বা নিয়ম জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে সেই ক্ষমতার মধ্যেই তা সংশোধন, পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

আদালত আরও জানায়, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার যে সার্কুলার জারি করেছিলেন, সেটি রেজিস্ট্রারের নির্দেশেই করা হয়েছিল। ফলে সেটিকে ক্ষমতার অপব্যবহার বলা যায় না। রাজ্য সরকারও আদালতে এই অবস্থান অস্বীকার করেনি।

রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট করে যে, আইনের ৯৫(৩) ধারায় বিধানসভায় নিয়ম পেশ করার যে প্রক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে, তা বাধ্যতামূলক নয়, বরং নির্দেশমূলক (directory)। তাই সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হলেও রেজিস্ট্রারের ক্ষমতা বা সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যায় না।

আদালত আরও উল্লেখ করে, কোনও প্রশাসনিক নির্দেশ আইনকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। কিন্তু এখানে আইন নিজেই রেজিস্ট্রারকে পরিষেবা সংক্রান্ত নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। তাই সংশোধনীটিকে ‘সার্কুলার’ বলা হয়েছে নাকি অন্য কোনও নামে ডাকা হয়েছে, তা তার আইনি বৈধতাকে প্রভাবিত করে না।

সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে, দীর্ঘদিন আগে বৈধভাবে দেওয়া কোনও পদোন্নতি বহু বছর পর অযথা বাতিল করা উচিত নয়। একজন কর্মচারীর ন্যায্য প্রত্যাশা থাকে যে, দীর্ঘ সময় পর তাঁর পদোন্নতি আর প্রশ্নের মুখে পড়বে না।

এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট চন্দ্রাকরের আপিল মঞ্জুর করে। আদালত নির্দেশ দেয়, তাঁকে পুনরায় অতিরিক্ত ম্যানেজারের পদ ও মর্যাদায় বহাল করতে হবে, তাঁর জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে এবং তাঁকে ৫০ শতাংশ বকেয়া বেতন প্রদান করতে হবে।

কেস টাইটেল: S. P. Chandrakar v. State of Chhattisgarh (Neutral Citation: 2026 INSC 769)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button