সুপ্রিমকোর্ট

রাশিয়া যুদ্ধে নিহত ভারতীয়দের দেহ ফেরাতে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করল সুপ্রিম কোর্ট

ক্ষতিপূরণ ও দেহ ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রককে বিশেষ নির্দেশ আদালতের

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতারণার শিকার হয়ে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হওয়া ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যু, নিখোঁজ হওয়া এবং ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত পররাষ্ট্র মন্ত্রককে (MEA) একজন বিশেষ নোডাল অফিসার নিয়োগ, নিহতদের দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার আগে বাধ্যতামূলক ডিএনএ পরীক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনা-র বেঞ্চ সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে এই নির্দেশ দেয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, বহু ভারতীয় যুবককে নির্মাণ, হোটেল ও পরিষেবা খাতে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক রুশ সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হয়।

আদালত জানায়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বহু ভারতীয় যুবক এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের দেহাবশেষ এখনও পরিবারের হাতে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে নিহতদের পরিবার এখনও ক্ষতিপূরণও পায়নি। এই পরিস্থিতিতে সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য একাধিক নির্দেশ জারি করা প্রয়োজন বলে আদালত মনে করে।

সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রক অবিলম্বে একজন নোডাল অফিসার নিয়োগ করবে। ওই কর্মকর্তার ফোন নম্বর ও যোগাযোগের সমস্ত তথ্য নিহত বা আহত ভারতীয়দের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে পরিবারগুলির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা যায়।

আদালত আরও জানিয়েছে, কোনও ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হলে তাঁর দেহাবশেষ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আগে বাধ্যতামূলকভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের নমুনার সঙ্গে দেহাবশেষের ডিএনএ মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পরই দেহ হস্তান্তর করা যাবে।

এছাড়া রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে কী কী নথি লাগবে এবং কীভাবে আবেদন করতে হবে, সেই সংক্রান্ত সম্পূর্ণ নির্দেশিকা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সরবরাহ করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। পরিবারগুলি চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মাধ্যমে রুশ কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন জমা দিতে পারবে।

তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, ক্ষতিপূরণের আবেদন বিচারাধীন থাকলেও নিহতদের দেহ ভারতে ফিরিয়ে আনা বা শেষকৃত্যের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা যাবে না। দুটি প্রক্রিয়া আলাদাভাবে এবং দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।

সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় ও রাজ্য আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষকেও নির্দেশ দিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে হবে। ডিএনএ পরীক্ষা, ক্ষতিপূরণের আবেদন এবং রাশিয়ার কাছ থেকে পাওয়া প্রয়োজনীয় নথি বুঝতে পরিবারগুলিকে সাহায্য করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের থাকবে।

শুনানিতে কেন্দ্রের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি আদালতকে জানান, সরকার ইতিমধ্যেই ২১৯ জন ভারতীয় নাগরিকের অবস্থান শনাক্ত করেছে। মামলায় উল্লিখিত ২৬ জনের মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। একজন বর্তমানে রাশিয়ায় আটক রয়েছেন এবং বাকি ২৫ জন স্বেচ্ছায় রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বলে সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে।

তিনি আরও জানান, রুশ কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র নিহত বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে আগ্রহী। তৃতীয় পক্ষ বা বিভিন্ন কর্মীর মাধ্যমে তারা কোনও প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে চায় না। তাঁর অভিযোগ, কিছু আইনজীবী ভুল তথ্য দিয়ে পরিবারগুলিকে দেহ গ্রহণ বা ক্ষতিপূরণের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে উৎসাহিত করছেন।

অন্যদিকে আবেদনকারীদের আইনজীবী দাবি করেন, অনেক সময় ভারতে ফিরে আসা দেহাবশেষ এতটাই পচে যায় যে তা চেনা সম্ভব হয় না। কখনও শুধু হাড় বা শরীরের কিছু অংশ ফিরে আসে। তাই পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়ার আগে ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরির আবেদন জানান তিনি।

শুনানির সময় আবেদনকারীদের আইনজীবীর বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, মার্চ মাসে স্বাক্ষরিত হলফনামার সঙ্গে জুলাই মাসে আবেদন দাখিল করা অত্যন্ত গাফিলতির পরিচয়। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও মন্তব্য করেন, একজন আইনজীবীর উচিত সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের পরিবর্তে পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে আদালতে নির্দিষ্ট আইনি বিষয় তুলে ধরা।

শেষ পর্যন্ত আদালত পররাষ্ট্র মন্ত্রকের জমা দেওয়া স্ট্যাটাস রিপোর্ট নথিভুক্ত করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির স্বার্থে উপরোক্ত নির্দেশগুলি জারি করে। কেন্দ্রও আদালতকে আশ্বস্ত করেছে যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে এবং রুশ সরকারের সহযোগিতায় ভারতীয় নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

কেস টাইটেল: Divya and Others v. Union of India and Others
মামলা নম্বর: Writ Petition (Civil) No. 451 of 2026

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button