ভোটার কার্ড বা আধার নয়, নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয় বলল হাইকোর্ট
এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়ার পর আটক ব্যক্তির আবেদন খারিজ আদালতের

কলকাতা হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ এক রায়ে জানিয়েছে, ভোটার পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কিংবা জমির রেকর্ড—এর কোনওটিই এককভাবে ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না। আদালত আরও বলেছে, কোনও ব্যক্তিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিক বলে দাবি করলে, নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করার দায়িত্ব সেই ব্যক্তির ওপরই বর্তায়।
বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি অজয় কুমার গুপ্তের ডিভিশন বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করে এক ব্যক্তির দায়ের করা রিট আবেদন খারিজ করে দেয়। আবেদনকারী দাবি করেছিলেন, তাঁর ভাইপোকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছে। তবে আদালত জানায়, মামলায় উপস্থাপিত নথি ভারতীয় নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।
মামলার আবেদনকারী সুমন মোল্লা। তাঁর অভিযোগ ছিল, ২০২৬ সালের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ (SIR) প্রক্রিয়ায় তাঁর ভাইপোর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের ১৮ জুন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২ মে, ২০২৫-এর একটি সার্কুলারের ভিত্তিতে তাঁকে আটক করে একটি ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়।
আবেদনকারীর দাবি ছিল, এসআইআর-২০২৬ প্রক্রিয়ায় প্রথমে তাঁর ভাইপোর নাম ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হলেও সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল এখনও বিচারাধীন। এছাড়া এসআইআর ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কোনও শুনানির সুযোগ দেয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
আবেদনকারীর পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, আটক ব্যক্তির প্রপিতামহের নামে সিএস রেকর্ড অব রাইটসে জমির নথি রয়েছে। এছাড়া তাঁর কাছে ভোটার পরিচয়পত্র, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন সরকারি নথিও রয়েছে। তাই তাঁকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
তবে আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, ভোটার পরিচয়পত্র কেবলমাত্র ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত থাকার প্রমাণ, এটি ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। আদালত উল্লেখ করে, এসআইআর-২০২৬ প্রক্রিয়ায় আটক ব্যক্তির নাম ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
আদালত আরও বলে, আধার কার্ড নিজে থেকে ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। একইভাবে আয়কর দপ্তরের দেওয়া প্যান কার্ডও নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না। কোনও ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা বা তাঁর পূর্বপুরুষের নামে জমির রেকর্ড থাকা থেকেও নিশ্চিতভাবে প্রমাণ হয় না যে তিনি ভারতীয় নাগরিক।
মামলার নথি পর্যালোচনা করে আদালত দেখতে পায়, ১৮ জুন, ২০২৬-এ জারি হওয়া আটকাদেশে উল্লেখ রয়েছে যে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ এবং নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই ভিত্তিতেই ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫ এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অর্ডার, ২০২৫-এর সংশ্লিষ্ট বিধান প্রয়োগ করে তাঁকে আটক করা হয়।
আদালত আরও উল্লেখ করে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যখন কাউকে বিদেশি নাগরিক বলে দাবি করে, তখন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ১৯৪৬-এর ১৬ ধারা অনুযায়ী নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার দায় আটক ব্যক্তির ওপরই বর্তায়।
বেঞ্চের নজরে আসে, ডিটেনশন সেন্টারে থাকাকালীন আটক ব্যক্তি নিজেই এক পর্যায়ে বাংলাদেশি নাগরিক হওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। আদালত এই বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
এছাড়া আদালত লক্ষ্য করে, মামলার আবেদনের সঙ্গে আটক ব্যক্তির জন্ম সনদ জমা দেওয়া হয়নি। তাঁর জন্মস্থান বা জন্মতারিখ প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত নথিও আদালতে পেশ করা হয়নি। ফলে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আরও একটি বিষয়ে আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করে। আদালতের একাধিক প্রশ্ন সত্ত্বেও আবেদনকারী আটক ব্যক্তির বাবা-মায়ের মরদেহ কোথায় সমাহিত বা দাফন করা হয়েছে, সেই তথ্য দিতে পারেননি। এই বিষয়েও আদালত আবেদনকারী এবং আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিরূপ অনুমান (adverse inference) গ্রহণ করে।
সমস্ত তথ্য ও নথি বিবেচনা করে কলকাতা হাইকোর্ট জানায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার কোনও কারণ নেই। ফলে আটক ব্যক্তিকে মুক্তির আবেদন জানিয়ে দায়ের করা রিট পিটিশন খারিজ করে দেয় আদালত।
কেস টাইটেল: Suman Molla v. The State of West Bengal and Ors.
কেস নম্বর: WPA(H)/58/2026



