হাইকোর্ট

ট্রাস্টি হলেই ফৌজদারি দায় নয়, বিদেশি আইনে এফআইআর বাতিল হাইকোর্টের

আশ্রমের ট্রাস্টি হওয়া মানেই আইনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘কিপার’ নন, জানাল আদালত স্লাগ:

একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হওয়া মাত্রই তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালানো যায় না। যদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আইনের অধীনে নির্ধারিত দায়িত্বপ্রাপ্ত না হন বা তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকে, তাহলে শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা যাবে না। এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ হাইকোর্ট।

বিচারপতি এম. এ. চৌধারি ইন্দর কৃষ্ণ রায়নার দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানি শেষে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর বাতিল করে এই রায় দেন। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, মামলার নথিতে অন্য কারও বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ থাকলে তদন্তকারী সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।

মামলার সূত্রপাত ২০২৪ সালে। পুলিশের অভিযোগ ছিল, আর্জেন্টিনার এক নাগরিক ২০২১-২২ সালে জম্মুর ঈশ্বর আশ্রম ট্রাস্টের একটি শাখায় অবস্থান করেছিলেন। কিন্তু বিদেশি নাগরিকদের থাকার তথ্য অনলাইন সি-ফর্ম (C-Form) ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়নি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে নওয়াবাদ থানায় বিদেশি আইন, ১৯৪৬-এর ৭ এবং ১৪ ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়।

প্রসিকিউশনের দাবি ছিল, ইন্দর কৃষ্ণ রায়না ট্রাস্টের পরিচালনা কমিটির সদস্য হওয়ায় বিদেশি নাগরিকের অবস্থানের তথ্য না জানানোর জন্য তিনিও দায়ী। কিন্তু রায়না আদালতে জানান, তিনি কেবল ট্রাস্টের একজন সদস্য। আশ্রমের দৈনন্দিন পরিচালনা, বিদেশি অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করা বা প্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণের দায়িত্ব তাঁর ছিল না। তাই বিদেশি আইনের অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর কোনও আইনগত ভিত্তি নেই।

অন্যদিকে, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীরের পক্ষ থেকে আদালতে বলা হয়, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে আবেদনকারীর ভূমিকা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা যায় না। তাই এই অবস্থায় আদালতের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত বিদেশি আইন, ১৯৪৬-এর ৭ ধারা বিশদভাবে পর্যালোচনা করে। আদালত জানায়, এই ধারায় বিদেশি নাগরিকদের থাকার তথ্য জানানো এবং প্রয়োজনীয় রেকর্ড সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধুমাত্র সেই ব্যক্তির ওপর বর্তায়, যিনি সংশ্লিষ্ট আবাসনের প্রকৃত ‘কিপার’ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। আইনটি ট্রাস্টি, পদাধিকারী বা পরিচালনা কমিটির প্রত্যেক সদস্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়ী করে না।

আদালত আরও উল্লেখ করে, কোনও ব্যক্তিকে ‘কিপার’ হিসেবে গণ্য করতে হলে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকতে হবে যে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের আবাসন পরিচালনা করতেন, বিদেশিদের থাকার ব্যবস্থা করতেন অথবা আইনে নির্ধারিত রিপোর্টিংয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এই মামলার এফআইআরে এমন কোনও অভিযোগ করা হয়নি।

রায়ে বিচারপতি চৌধারি বলেন, কেবলমাত্র কোনও ট্রাস্ট বা প্রতিষ্ঠানের ট্রাস্টি বা সদস্য হওয়া ফৌজদারি দায় আরোপের জন্য যথেষ্ট নয়। ফৌজদারি দায় সর্বদাই ব্যক্তিগত এবং তা নির্দিষ্ট ভূমিকা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে কাউকে অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা আইনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

আদালত এ ক্ষেত্রেও কেরল হাইকোর্টের পূর্ববর্তী কয়েকটি রায়ের ওপর নির্ভর করে। সেই রায়গুলিতেও বলা হয়েছিল, বিদেশি আইনের অধীনে ‘কিপার’ বলতে সেই ব্যক্তিকেই বোঝায়, যিনি বাস্তবে সংশ্লিষ্ট আবাসনের দায়িত্বে থাকেন এবং বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী তথ্য জানানোর দায়িত্ব পালন করেন।

সব দিক বিবেচনা করে হাইকোর্টের মত, আবেদনকারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা এফআইআরে অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান বা নির্দিষ্ট অভিযোগের উল্লেখ নেই। তাই তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার হবে। এই কারণেই আদালত ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নওয়াবাদ থানায় দায়ের হওয়া এফআইআরটি আবেদনকারী ইন্দর কৃষ্ণ রায়নার ক্ষেত্রে বাতিল করে দেয়। তবে তদন্তকারী সংস্থা অন্য কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ চালিয়ে যেতে পারবে বলেও আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে।

কেস টাইটেল: Inder Krishan Raina v. Union Territory of J&K through SHO Police Station, Nawabad, Jammu

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button