হাইকোর্ট

জন্মের সময় এসসি মর্যাদা পেলে পরে সংরক্ষণ সুবিধা কেড়ে নেওয়া যাবে না

সংসদ পরে তফসিলি জাতির তালিকা বদলালেও অর্জিত অধিকার বহাল থাকবে, গুজরাট হাইকোর্টের রায়

গুজরাট হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে জানিয়েছে, কোনও ব্যক্তি জন্মের সময় যে জাতিতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেই সময় যদি ওই জাতি সংবিধান অনুযায়ী তফসিলি জাতি (Scheduled Caste বা SC) হিসেবে স্বীকৃত থাকে, তাহলে পরবর্তীকালে সংসদ সেই জাতিকে তফসিলি জাতির তালিকা থেকে বাদ দিলেও তাঁর সংরক্ষণের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। আদালত স্পষ্ট করেছে, জন্মসূত্রে অর্জিত এবং আইনসম্মতভাবে প্রাপ্ত সংরক্ষণের সুবিধা একজন কর্মচারীর পুরো চাকরি জীবন জুড়েই বহাল থাকবে।

বিচারপতি এন. এস. সঞ্জয় গৌড়া এবং বিচারপতি জে. এল. ওদেরার ডিভিশন বেঞ্চ ১৭ জুলাই ২০২৬ এই রায় দেয়। আদালত কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংস্থা (Employees’ Provident Fund Organisation বা EPFO)-এর করা আবেদন খারিজ করে কর্মী রঞ্জিত বসন্তলাল মকওয়ানার পদোন্নতি বহাল রাখে।

মামলার পটভূমি

রঞ্জিত বসন্তলাল মকওয়ানা ১৯৯৫ সালে ইপিএফও-তে লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক (Lower Division Clerk) পদে তফসিলি জাতি সংরক্ষিত কোটায় নিয়োগ পান। সেই সময় ১৯৭৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের তফসিলি জাতি আদেশ অনুযায়ী গুজরাট জুড়ে মোচি (Mochi) সম্প্রদায়কে তফসিলি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি এনফোর্সমেন্ট অফিসার/অ্যাকাউন্টস অফিসার পদে পদোন্নতি পান।

কিন্তু ২০১২ সালে ইপিএফও তাঁকে আবার আপার ডিভিশন ক্লার্ক (Upper Division Clerk) পদে নামিয়ে দেয়। সংস্থার যুক্তি ছিল, ২০০২ সালের সংশোধনের মাধ্যমে গুজরাটে মোচি সম্প্রদায়ের তফসিলি জাতির মর্যাদা শুধুমাত্র ডাং জেলা এবং ভালসাদ জেলার উমরগাঁও তালুকার বাসিন্দাদের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ফলে মকওয়ানা আর সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মকওয়ানা কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে (CAT) মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল তাঁর পদোন্নতি পুনর্বহাল করে। এরপর সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে গুজরাট হাইকোর্টে যায় ইপিএফও।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

মামলার শুনানিতে গুজরাট হাইকোর্ট সংবিধানের ৩৪১ অনুচ্ছেদ এবং গুজরাটে তফসিলি জাতির তালিকার পরিবর্তনের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে।

আদালত জানায়, জাতিগত পরিচয় জন্মসূত্রে অর্জিত হয় এবং তা একজন মানুষের সারাজীবনের পরিচয়। তাই কোনও ব্যক্তি যখন জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই সময় যদি তাঁর জাতি সংবিধান অনুযায়ী তফসিলি জাতি হিসেবে স্বীকৃত থাকে, তাহলে সেই স্বীকৃতি থেকে প্রাপ্ত আইনগত অধিকার পরবর্তীকালে কেড়ে নেওয়া যায় না।

বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেছে,

“প্রতিবাদী তাঁর সারা জীবন সংরক্ষণের সমস্ত সুবিধা পাওয়ার অধিকারী থাকবেন এবং পরে তাঁর জাতিকে তফসিলি জাতির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হলেও সেই সুবিধা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা যাবে না।”

আদালত আরও জানায়, মকওয়ানা বৈধভাবে তফসিলি জাতির প্রার্থী হিসেবে চাকরি এবং পরে পদোন্নতি লাভ করেছিলেন। ফলে সেই সুবিধা তাঁর চাকরিজীবনের একটি অর্জিত অধিকার (vested service right) হয়ে গেছে। তাই ২০১২ সালে তাঁর পদোন্নতি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আইনসম্মত নয়।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রসঙ্গ

ইপিএফও তাদের যুক্তির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের একটি পুরনো রায়ের উল্লেখ করেছিল, যা একটি ডিলারশিপ বরাদ্দ সংক্রান্ত মামলার ছিল।

তবে গুজরাট হাইকোর্ট সেই যুক্তি গ্রহণ করেনি। আদালত জানায়, সরকারি চাকরি এবং ডিলারশিপ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অধিকার। সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের ভিত্তিতে বৈধভাবে অর্জিত নিয়োগ ও পদোন্নতি কর্মচারীর স্থায়ী চাকরিগত অধিকার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ডিলারশিপের ক্ষেত্রে কেবল একটি অস্থায়ী সুবিধা বা ‘লেটার অফ ইনটেন্ট’-এর ভিত্তিতে দাবি তৈরি হয়। তাই ওই সুপ্রিম কোর্টের রায় বর্তমান মামলায় প্রযোজ্য নয়।

আদালতের সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট জানায়, যেহেতু রঞ্জিত বসন্তলাল মকওয়ানা সারাজীবন তফসিলি জাতির প্রার্থী হিসেবে সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়ার অধিকারী, তাই পদোন্নতির ক্ষেত্রে শূন্যপদ সৃষ্টির তারিখ নাকি পদোন্নতির তারিখ বিবেচ্য হবে— সেই প্রশ্নে আর আলাদা সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

ফলে আদালত কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে ইপিএফও-র রিট আবেদন খারিজ করে এবং মকওয়ানার পদোন্নতি বহাল রাখার নির্দেশ দেয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button