পারিবারিক বিরোধে সাজানো অভিযোগ, পকসো মামলা খারিজ করল সুপ্রিম কোর্ট
বিবাহবিচ্ছেদের পর শিশুদের হাতিয়ার করা হয়েছে, অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয় বলল আদালত

একটি তীব্র পারিবারিক বিরোধের জেরে দায়ের হওয়া পকসো (POCSO) মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত এক মহিলার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা খারিজ করে জানিয়েছে, এফআইআরটি নানা অসঙ্গতিতে ভরা এবং অভিযোগের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব রয়েছে। আদালতের মতে, বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানদের হেফাজত নিয়ে চলা বিরোধের জেরে শিশুদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তাই এই মামলার ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা ন্যায়সঙ্গত হবে না।
বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চ ২৩ জুলাই ২০২৬ এই রায় দেয়। আদালত মহারাষ্ট্রের পুনের খড়কি থানায় দায়ের হওয়া ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারা এবং পকসো আইনের ৮ ধারার অধীনে নথিভুক্ত এফআইআর বাতিল করে দেয়।
মামলার পটভূমি
এই মামলার সূত্রপাত হয় এক দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদ এবং যমজ সন্তানদের হেফাজত নিয়ে বিরোধ থেকে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, বাবা দুই সন্তানের হেফাজত পান এবং মাকে সন্তানদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে দেখা করার অধিকার দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৭ মার্চ ২০২৪-এ মা একটি এফআইআর দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলেকে তার পিতৃকাকিমা (বাবার বোন) যৌন হেনস্তা করেছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি ঘটনায় তিনি নিজেই উপস্থিত ছিলেন এবং বিষয়টি তাঁর স্বামীকে জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে এই অভিযোগের সময় নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
আদালত লক্ষ্য করে, ওই এফআইআর দায়েরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শিশুটির বাবা আরেকটি প্রায় একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, যমজ কন্যাশিশুকে তার মামা যৌন হেনস্তা করেছেন। এই ঘটনাক্রম আদালতের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, এর আগে বোম্বে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। সেই বেঞ্চও মনে করেছিল, মায়ের অভিযোগে পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই।
বিশেষ করে আদালত উল্লেখ করে, ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে শিশুটির যে জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছিল, সেখানে সে মায়ের অভিযোগকে সমর্থন করেনি।
কিন্তু পরবর্তীকালে বোম্বে হাইকোর্টের অন্য একটি ডিভিশন বেঞ্চ আগের নথি যথাযথভাবে বিবেচনা না করেই মামলাটি বিচারের জন্য এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেয়।
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানায়, “এফআইআরটি সাধারণভাবে পড়লেই সেটি বিশ্বাস জাগায় না।”
আদালত আরও উল্লেখ করে, বিবাহবিচ্ছেদের সময় বা সেই সংক্রান্ত মামলায় কখনও এই ধরনের অভিযোগ তোলা হয়নি। এমনকি সুপ্রিম কোর্টে নোটিস পাঠানো হলেও অভিযোগকারী মা আদালতে উপস্থিত হননি এবং নিজের অভিযোগের পক্ষে কোনও বক্তব্যও উপস্থাপন করেননি।
আদালতের সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করে, এই মামলায় শিশুদের বৈবাহিক বিরোধের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আদালতের মতে, পারিবারিক বিবাদের জেরে মিথ্যা বা দুর্বল অভিযোগ এনে কাউকে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলা উচিত নয়।
আদালত জানায়, অভিযোগে এমন কোনও বিশ্বাসযোগ্য উপাদান নেই, যার ভিত্তিতে অভিযুক্ত মহিলাকে ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি করা যেতে পারে।
ফলে পুনের খড়কি থানায় ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪ ধারা এবং পকসো আইনের ৮ ধারায় দায়ের হওয়া এফআইআর সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা হয় এবং আপিল মঞ্জুর করা হয়।
এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আবারও স্পষ্ট করেছে, পারিবারিক বিরোধ বা হেফাজতের লড়াইয়ে শিশুদের ব্যবহার করে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হলে আদালত অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করবে। কেবল অভিযোগ দায়ের হলেই বিচার চলবে— এমন নয়; অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়াও সমানভাবে প্রয়োজন।
কেস টাইটেল: A. A. S. v. State of Maharashtra & Anr.



