সুপ্রিমকোর্ট

চেকে দৃশ্যমান কারচুপি প্রমাণিত, এনআই আইনের মামলায় অভিযুক্তকে খালাস দিল সুপ্রিম কোর্ট

চেকে অঙ্ক ও শব্দ পরিবর্তন স্পষ্ট, তাই দণ্ড বহাল রাখা যায় না বলল আদালত

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (Negotiable Instruments) আইনের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত এক ব্যক্তিকে খালাস দিয়েছে। আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে, যে চেককে ভিত্তি করে মামলা করা হয়েছিল, সেটিতে স্পষ্টভাবে “ম্যাটেরিয়াল অল্টারেশন” বা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই পরিবর্তন চেকের ওপরই দৃশ্যমান ছিল। তাই ওই চেকের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করা আইনসম্মত নয় বলে জানিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

বিচারপতি সঞ্জয় কুমার এবং বিচারপতি সঞ্জীব সচদেবা-র ডিভিশন বেঞ্চ এই রায়ে জানিয়েছে, চেকে এমন পরিবর্তন যদি চোখে পড়ার মতো স্পষ্ট হয়, তাহলে সেটি প্রমাণ করার জন্য আলাদা করে অতিরিক্ত সাক্ষ্য বা প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্টের উচিত ছিল চেকটি দেখে সেই পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া।

মামলার পটভূমি

এই মামলার আবেদনকারী ছিলেন রাজাসাব। কর্নাটক হাইকোর্ট এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস আইনের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রেখেছিল। তবে জরিমানার পরিমাণ ₹১,১৫,০০০ থেকে কমিয়ে ₹১,১০,০০০ করা হয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সেই অর্থ অভিযোগকারী হুলাগাপ্পাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানও করা হয়।

এরপর রাজাসাব সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন। তাঁর দাবি ছিল, তিনি মূলত ₹১০,০০০ টাকার একটি চেক দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সেই চেকে বেআইনিভাবে পরিবর্তন এনে সেটিকে ₹১,১০,০০০ টাকার চেক হিসেবে দেখানো হয়। ফলে সেই পরিবর্তিত চেকের ভিত্তিতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ

মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট মূল চেকটি খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে। আদালত দেখতে পায়, চেকে লেখা “Ten Thousand only”-এর আগে “One Lak” শব্দ দুটি যুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে অঙ্কের ঘরে “10,000”-এর আগে অতিরিক্ত “1” বসিয়ে সেটিকে “1,10,000” করা হয়েছে।

আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানায়, এই পরিবর্তন চেকের ওপরই দৃশ্যমান এবং তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলে, “চেকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি স্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান।”

আদালত আরও জানায়, যখন কোনও চেকে এই ধরনের পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো পরিষ্কার থাকে, তখন সেটি প্রমাণের জন্য আলাদা সাক্ষ্য বা বিশেষ প্রমাণ দাবি করা উচিত নয়। নিম্ন আদালতগুলি এই বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।

আদালতের রায়

সুপ্রিম কোর্ট রাজাসাবের আপিল গ্রহণ করে ট্রায়াল কোর্ট, আপিল আদালত এবং কর্নাটক হাইকোর্টের সমস্ত রায় বাতিল করে দেয়।

একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেয়, হাইকোর্টের আগের আদেশ অনুযায়ী অভিযোগকারী হুলাগাপ্পা যে অর্থ পেয়েছেন, তা চার সপ্তাহের মধ্যে রাজাসাবকে ফেরত দিতে হবে।

এছাড়া, যদি ট্রায়াল কোর্টে এখনও কোনও অর্থ জমা থেকে থাকে, তাহলে রাজাসাব সেই অর্থ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তার সুদসহ ফেরত পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন বলেও আদালত নির্দেশ দিয়েছে।

রায়ের গুরুত্ব

নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস আইনের ১৩৮ ধারা মূলত চেক বাউন্স সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করে। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ে স্পষ্ট করেছে, চেকে যদি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বা কারচুপি করা হয় এবং তা চেকের ওপরই দৃশ্যমান থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তিত চেকের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।

এই রায় ভবিষ্যতে চেক জালিয়াতি বা চেকে বেআইনি পরিবর্তন সংক্রান্ত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে আদালত বার্তা দিয়েছে যে, নথির সত্যতা যাচাই না করে শুধুমাত্র চেক বাউন্সের অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত নয়।

কেস টাইটেল: Rajasab v. Hulagappa

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button