সেশনস আদালতের প্রথম দণ্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল নয়, জানাল সুপ্রিম কোর্ট
খালাস বাতিল করে দণ্ড দিলে আপিল নয়, রিভিশনই হবে একমাত্র আইনি প্রতিকার

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করেছে, যা দীর্ঘদিন ধরে ফৌজদারি আদালতগুলিতে বিতর্কের বিষয় ছিল। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও ব্যক্তি যদি ট্রায়াল কোর্টে খালাস পাওয়ার পর সেশনস আদালত আপিল শুনানির সময় প্রথমবারের মতো তাকে দোষী সাব্যস্ত করে, তাহলে সেই দণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির (Cr.P.C.) ৩৭৪ ধারায় হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন না। এই ক্ষেত্রে তাঁর একমাত্র প্রতিকার হবে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা।
বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি. ভারালের বেঞ্চ এই রায়ে জানিয়েছে, Cr.P.C.-এর ৩৭৪ ধারা (বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩-এর ৪১৫ ধারা) অনুযায়ী সেশনস আদালত আপিল শুনানির সময় যে দণ্ডাদেশ দেয়, তার বিরুদ্ধে পুনরায় আপিলের কোনও বিধান নেই।
ঘটনার সূত্রপাত একটি বৈবাহিক বিরোধকে কেন্দ্র করে। বিষ্ণু কুমার গুপ্তের স্ত্রী ইন্দোরে একটি জিরো এফআইআর দায়ের করেন। অভিযোগ ছিল, স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন, মানসিক অত্যাচার এবং পণের দাবিতে হয়রানি করেছেন। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮-এ ধারা এবং পণনিষেধ আইনের অধীনে মামলা দায়ের হওয়ার পর সেটি ভিন্দে স্থানান্তরিত হয় এবং সেখানে চার্জশিট জমা পড়ে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ট্রায়াল কোর্ট প্রমাণের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে তিন অভিযুক্তকেই খালাস দেয়। এরপর অভিযোগকারী স্ত্রী সেই রায়ের বিরুদ্ধে ভিন্দের সেশনস আদালতে আপিল করেন।
২০২৫ সালের মে মাসে সেশনস আদালত আংশিকভাবে ট্রায়াল কোর্টের রায় বদলে দেয়। আদালত শ্বশুর-শাশুড়ির খালাস বহাল রাখলেও স্বামী বিষ্ণু কুমার গুপ্তকে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮-এ ধারায় তিন বছরের কারাদণ্ড এবং পণনিষেধ আইনে আরও দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত নির্দেশ দেয়, এই দুই সাজা ধারাবাহিকভাবে ভোগ করতে হবে।
এরপর বিষ্ণু কুমার গুপ্ত Cr.P.C.-এর ৩৭৪ ধারার অধীনে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে আপিল করেন। কিন্তু হাইকোর্ট প্রাথমিক পর্যায়েই সেই আপিল খারিজ করে জানায়, এটি কার্যত দ্বিতীয় আপিল হয়ে যাবে, যার কোনও আইনি ভিত্তি নেই। আদালত জানায়, এই পরিস্থিতিতে কেবল রিভিশন আবেদনই করা যেতে পারে। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।
সুপ্রিম কোর্টে আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দেন, এটি তাঁর জীবনের প্রথম দণ্ডাদেশ। ফলে তাঁকে আপিলের সুযোগ না দেওয়া হলে সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। তাঁর দাবি ছিল, সেশনস আদালতের দণ্ডাদেশও মূল বিচারের ভিত্তিতেই হয়েছে, তাই সেটিকে ট্রায়ালের অংশ হিসেবে গণ্য করে আপিলের সুযোগ দেওয়া উচিত।
অন্যদিকে রাজ্য সরকার এবং অভিযোগকারীর পক্ষ জানায়, আপিল করার অধিকার সম্পূর্ণভাবে আইন দ্বারা নির্ধারিত। যেহেতু আইন সেশনস আদালতের আপিলে দেওয়া দণ্ডের বিরুদ্ধে আরেকটি আপিলের সুযোগ দেয়নি, তাই হাইকোর্টে কেবল রিভিশনই গ্রহণযোগ্য।
সুপ্রিম কোর্ট এই মামলায় ‘ট্রায়াল’ শব্দের অর্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে। আদালত সংবিধান বেঞ্চের Hardeep Singh v. State of Punjab মামলাসহ একাধিক পূর্ববর্তী রায়ের উল্লেখ করে জানায়, ট্রায়াল শুরু হয় অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এবং শেষ হয় দোষী সাব্যস্ত বা খালাসের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে। আপিলের কার্যক্রম ট্রায়ালের ধারাবাহিকতা হলেও তা কখনও ট্রায়াল নয়।
বেঞ্চ আরও স্পষ্ট করে জানায়, সেশনস আদালত যখন কোনও আপিলের শুনানি করে, তখন সে ট্রায়াল কোর্ট হিসেবে নয়, আপিল আদালত হিসেবেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে। তাই আপিল শুনানিতে প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তির জন্য ৩৭৪ ধারায় নতুন করে আপিলের অধিকার সৃষ্টি হয় না।
এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৯ সালে হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের Arun Sharma v. State of Himachal Pradesh মামলার সিদ্ধান্তও বাতিল করে দেয়। সেই রায়ে একই ধরনের পরিস্থিতিতে আপিল গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ওই সিদ্ধান্ত সঠিক আইন ব্যাখ্যা করেনি।
তবে আদালত এও বলেছে, এ ধরনের অভিযুক্তরা কোনও আইনি প্রতিকার ছাড়া থাকবেন না। তাঁরা Cr.P.C.-এর ৩৯৭ ও ৪০১ ধারার অধীনে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করতে পারবেন। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছে, যেহেতু এই ধরনের অভিযুক্তরা পূর্ণাঙ্গ আপিলের সুযোগ পান না, তাই তাঁদের রিভিশন আবেদন হাইকোর্টকে আরও উদার ও গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত।
শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট বিষ্ণু কুমার গুপ্তের আপিল খারিজ করে দেয়। তবে তাঁকে সেশনস আদালতের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী রিভিশন আবেদন করার স্বাধীনতা প্রদান করা হয়।
কেস টাইটেল: Vishnu Kumar Gupta v. State of Madhya Pradesh and Another



