সুপ্রিমকোর্ট

আজীবন কারাবাসের সাজা বৈধ, চার বন্দির আবেদন খারিজ সুপ্রিম কোর্টের

প্রাকৃতিক জীবনের শেষ পর্যন্ত কারাদণ্ড সাংবিধানিকভাবে বৈধ, পুনর্বিবেচনার সুযোগ নেই বলল আদালত

প্রাকৃতিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কারাদণ্ডের সাজা আইনসম্মত এবং ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই শাস্তির বৈধতা স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই একই বিষয় আবার নতুন করে চ্যালেঞ্জ করা যায় না। এই পর্যবেক্ষণ করে চারজন দণ্ডিত বন্দির দায়ের করা পৃথক চারটি রিট পিটিশন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি অগাস্টিন জর্জ মাসিহের ডিভিশন বেঞ্চ একসঙ্গে চারটি মামলার অভিন্ন আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে এই রায় দেয়।

মামলার পটভূমি

মূল আবেদনটি করেছিলেন রামশ্রেয় ওরফে ফক্কড়। তাঁর দাবি ছিল, ভারতীয় দণ্ডবিধিতে (IPC) খুনের অপরাধে কেবল দুটি শাস্তির কথাই বলা হয়েছে—মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। কিন্তু প্রাকৃতিক জীবনের শেষ পর্যন্ত কারাবাস নামে আলাদা কোনও শাস্তির উল্লেখ আইনে নেই। তাই এই ধরনের সাজা দেওয়া আইনসঙ্গত নয়।

একই ধরনের যুক্তি তুলে পৃথক আবেদন করেন চন্দর কান্ত ঝা, আতবির সিং এবং সরবজিৎ সিং, গুরদেব সিং ওরফে বলদেব সিং এবং সতনাম সিং। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেন, এই ধরনের সাজা তাঁদের আইনে স্বীকৃত রেমিশন বা সাজা হ্রাসের অধিকারকেও কার্যত অকার্যকর করে দেয়।

সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে তাঁরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়ে এই সাজা বাতিলের আবেদন জানান।

আদালতের পর্যবেক্ষণ

প্রথমেই সুপ্রিম কোর্ট বিবেচনা করে, এই ধরনের আবেদন সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে গ্রহণযোগ্য কি না।

আদালত জানায়, মৌলিক অধিকার রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের বিস্তৃত ক্ষমতা থাকলেও, সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়া যায় না। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের দয়া প্রার্থনা (Clemency) সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩২ অনুচ্ছেদকে আপিলের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

আদালত স্পষ্টভাবে বলে, যদি আবেদনকারীদের যুক্তি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে সুপ্রিম কোর্টকে কার্যত নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আদালতের ভূমিকা পালন করতে হবে, যা সংবিধান অনুমোদন করে না।

রায়ে আরও বলা হয়, সংবিধানের ৭২ ও ১৬১ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের সিদ্ধান্তের বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ খুবই সীমিত। কেবলমাত্র যদি দেখা যায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথভাবে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি, অসৎ উদ্দেশ্য ছিল, অপ্রাসঙ্গিক তথ্যের ওপর নির্ভর করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপেক্ষা করা হয়েছে অথবা সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী, তাহলেই আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে।

বর্তমান মামলায় এই ধরনের কোনও কারণই প্রমাণিত হয়নি বলে জানিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

সাংবিধানিক বেঞ্চের রায়ই চূড়ান্ত

প্রাকৃতিক জীবনের শেষ পর্যন্ত কারাবাসের বৈধতা নিয়ে আপত্তি খারিজ করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আগের গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলির ওপর নির্ভর করে। বিশেষভাবে Swamy Shraddananda (2) এবং পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চের Union of India v. V. Sriharan মামলার রায়ের উল্লেখ করা হয়।

আদালত পুনর্ব্যক্ত করে, আইনের সাধারণ নীতি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে একজন দণ্ডিতের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কারাবাসকেই বোঝায়, যদি না আইন অনুযায়ী তাঁর সাজা হ্রাস বা মওকুফ করা হয়।

সাংবিধানিক বেঞ্চ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে যে, বিশেষ ও ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে প্রাকৃতিক জীবনের শেষ পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া বৈধ এবং আইনসম্মত।

দুই বিচারপতির বেঞ্চ মন্তব্য করে, পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ যখন এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে দিয়েছে, তখন একই বিষয় আবার দুই বিচারপতির বেঞ্চের সামনে উত্থাপন করা আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের সামিল।

আদালতের সিদ্ধান্ত

সুপ্রিম কোর্ট জানায়, রামশ্রেয় ওরফে ফক্কড় এবং চন্দর কান্ত ঝা তাঁদের রেমিশন সংক্রান্ত উপলব্ধ আইনগত ও সাংবিধানিক প্রতিকার আগে গ্রহণ করেননি।

অন্যদিকে, বাকি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ইতিমধ্যেই তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সিদ্ধান্তে বিচারিক হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় কোনও স্বীকৃত আইনি ভিত্তি আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়নি।

ফলে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে দায়ের করা চারটি রিট পিটিশনই খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট। পাশাপাশি মামলাগুলির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত মুলতুবি আবেদনও নিষ্পত্তি করা হয়।

কেস টাইটেল: Ramasrey @ Fakkad v. State of Uttar Pradesh (with connected writ petitions)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button